এসএসসি বিজ্ঞান সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
০১. বডি মাস ইনডেক্স প্রয়োজন কেন?
উত্তর: দেহের উচ্চতার সাথে ওজনের সামঞ্জস্য রক্ষা করার সূচকই হলো বডি মাস ইনডেক্স। উচ্চতার সাথে দেহের ওজনের সামঞ্জস্য থাকলে পুষ্টিগত দিক থেকে শরীর সুস্থ বলা হয়। বডি মাস ইনডেক্স বা BMI এর মাধ্যমে আমরা শরীরের ওজন উচ্চতা অনুযায়ী কতটুকু ঠিক আছে জানতে পারি এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে শরীরে ওজন ঠিক রাখতে পারি। তাই বডি মাস ইনডেক্স প্রয়োজন।
০২. ভিটামিন ‘সি’ কেন দৈনিক খেতে হয়?
উত্তর: প্রতিদিন ভিটামিন ‘সি’ খাওয়া প্রয়োজন। কারণ এটি দাঁতের গোড়া বা মাড়ি এবং দাঁতকে শক্ত রাখে, শরীরের ক্ষত পুনর্গঠন করে, স্নেহ আমিষ ও অ্যামাইনো এসিডের বিপাকে সাহায্য করে। এছাড়া ত্বক মসৃণ রাখে এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ করে। যেহেতু ভিটামিন সি শরীরে জমা থাকে না, তাই দৈনিক ভিটামিন সি খেতে হয়।
০৩. ‘ধূমপান বিষপান’ কেন বলা হয়?
উত্তর: ধূমপানের সময় বিড়ি বা সিগারেট থেকে যে ধোঁয়া নির্গত হয় তাতে নানা রকম বিষাক্ত গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থ থাকে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নিকোটিন, অ্যাসিটোন, হাইড্রোকার্বন ও কতগুলো আঠালো পদার্থ যা ফুসফুসের ক্যান্সার সৃষ্টি করে। এসব বিষাক্ত পদার্থের কারণে ধূমপায়ীরা দ্রুত রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে বলেই বলা হয় “ধূমপান বিষপান”।
০৪. আদর্শ খাদ্য পিরামিড বলতে কী বোঝ?
উত্তর: যে-খাদ্যে সবগুলো উপাদানই গুণাগুণ অনুসারে উপযুক্ত পরিমাণে থাকে তাদেরকে সুষম খাদ্য বলা হয়। যে কোনো সুষম খাদ্যতালিকায় শর্করা, শাকসবজি, ফলমূল, আমিষ এবং স্নেহ বা চর্বিজাতীয় খাদ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। শর্করা জাতীয় খাবারকে নিচে রেখে পরিমাণ বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে শাক-সবজি, ফলমূল, আমিষ, স্নেহ ও চর্বি জাতীয় খাদ্যকে সাজালে যে কাল্পনিক পিরামিড তৈরি হয় তা-ই আদর্শ খাদ্য পিরামিড।
০৫. খাদ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা লেখো।
উত্তর: খাদ্যের গুণগত মান ঠিক রাখতে যেসব উপায় অবলম্বন করা হয় তাই খাদ্য সংরক্ষণ। খাদ্য পচনে সহায়তাকারী অণুজীব ও পরিবেশের প্রভাবক উৎস সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বহুদিন পর্যন্ত খাদ্য সংরক্ষণ করা যায়। বাণিজ্যিকভাবে বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করে খাদ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা হয়। এছাড়া গৃহে সাধারণ সংরক্ষক দ্রব্যের ও যন্ত্রপাতির ব্যবহারে খাদ্য সংরক্ষণ করা হয়।
০৬. খাদ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা লেখো।
উত্তর: খাদ্যের গুণগত মান ঠিক রাখতে যেসব উপায় অবলম্বন করা হয় তাই খাদ্য সংরক্ষণ। খাদ্য পচনে সহায়তাকারী অণুজীব ও পরিবেশের প্রভাবক উৎস সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বহুদিন পর্যন্ত খাদ্য সংরক্ষণ করা যায়। বাণিজ্যিকভাবে বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করে খাদ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা হয়। এছাড়া গৃহে সাধারণ সংরক্ষক দ্রব্যের ও যন্ত্রপাতির ব্যবহারে খাদ্য সংরক্ষণ করা হয়।
০৭. খনিজ লবণের উৎস এবং এর অভাবজনিত প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: কোষ গঠনে খনিজ পদার্থ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। প্রাণী সাধারণত উদ্ভিজ্জ খাদ্য থেকে খনিজ পদার্থ পেয়ে থাকলেও বিভিন্ন প্রাণিজ খাদ্য থেকেও খনিজ পদার্থ পেয়ে থাকে। শাকসবজি, ফলমূল, দুধ, ডিম, মাছ ইত্যাদি খনিজ পদার্থের উৎকৃষ্ট উৎস যা হতে প্রচুর পরিমাণে লৌহ, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস প্রভৃতি পাওয়া যায়। খনিজ পদার্থের অভাবে রক্তশূন্যতা, রিকেটস, দন্তক্ষয় ইত্যাদি সহ নানা ধরনের শারিরীক সমস্যা হতে পারে।
০৮. এইডস বলতে কী বোঝ?
উত্তর: এইডস বা AIDS এর পূর্ণরূপ হলো- Acquired Immune Deficiency Syndrome। এইডস একটি মরণব্যধি। আজ পর্যন্ত এর চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি। HIV ভাইরাসের আক্রমণে এই রোগ হয়ে থাকে। HIV দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়। ফলে নানারকম রোগ জীবাণু দেহে বাসা বাঁধে। এমন এক পর্যায়ের সৃষ্টি হয় যার ফলে দেহ ক্রমে বিভিন্ন রোগ ধারণ করতে থাকে এবং একপর্যায়ে মানবদেহ মৃত্যুর মুখে পতিত হয়।
০৯. শারীরিক ফিটনেস বজায় রাখার কৌশল ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং শরীর চর্চার মাধ্যমে শারীরিক ফিটনেস বজায় রাখা যায়। যে সকল খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিশেষ করে ফাস্ট ফুড খাওয়া পরিহার করতে হবে। বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর খনিজ যেমন- ফলমূল, শাকসবজি, ডিম, দুধ প্রভৃতি পরিমাণমত খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। পাশাপাশি শারীরিক ব্যায়াম করতে হবে কেননা নিয়মিত মাংসপেশির ব্যায়ামের ফলে স্নায়ুতন্ত্র সতেজ ও সক্রিয় থাকে। এছাড়া পরিপাক করার ক্ষমতা বাড়ানো, রক্ত চলাচল, শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে নিয়মিত শরীর চর্চার ভূমিকা রয়েছে।
১০. প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন B জাতীয় খাবার রাখা আবশ্যক কেন?
উত্তর: পানিতে দ্রবণীয় মোট ১২টি ভিটামিন B রয়েছে যাদেরকে একত্রে ভিটামিন B কমপ্লেক্স বলে। দেহের স্বাভাবিক সুস্থতার জন্য খাদ্যে ভিটামিন ও কমপ্লেক্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেহের বৃদ্ধি, স্নায়ু ও মস্তিষ্কের কাজ, দেহকোষে বিপাক কাজ, প্রজনন ইত্যাদি সম্পন্ন করার জন্য খাদ্যে ভিটামিন B কমপ্লেক্সের উপস্থিতি অতি আবশ্যক।
১১. আমাদের পুষ্টিতে সূর্যের আলো প্রয়োজন কেন?
উত্তর: একমাত্র প্রাণিজ উৎস থেকেই ভিটামিন D পাওয়া যায়। এ ভিটামিন সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির সহায়তায় মানুষের ত্বকে সংশ্লেষিত হয়। ডিমের কুসুম, দুধ ও মাখন ভিটামিন D-এর প্রধান উৎস। বাঁধাকপি, যকৃৎ ও তেলসমৃদ্ধ মাছে ভিটামিন D পাওয়া যায়। এজন্য ভিটামিন সংশ্লেষণ তথা প্রাপ্তির জন্য সূর্যের আলো প্রয়োজন।
১২. কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে রাফেজ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার বিভিন্ন কারণের একটি প্রধান কারণ হলো অপাচ্য খাদ্যাংশ থেকে কোলনের অতিমাত্রায় পানি শোষণ করা। রাফেজ জাতীয় খাদ্য এই অপাচ্য খাদ্য নিষ্কাশনে সাহায্য করে এবং সরাসরি খাদ্যনালির মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে থাকে।
১৩. খাদ্য সংরক্ষণে ফরমালিন ব্যবহারের অনুমতি নেই কেন?
উত্তর: খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণে ফরমালিনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে মানবদেহে নানা জটিল রোগ; যেমন- বদহজম, পাতলা পায়খানা, পেটের পীড়া, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, লিভার ও কিডনি নষ্ট হওয়াসহ ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি হতে পারে। ফরমালিনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে গর্ভজাত সন্তান বিকলাঙ্গও হতে পারে। তাই খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ফরমালিন ব্যবহারের অনুমতি নেই।
১৪. খাদ্য উপাদান কয়টি ও কী কী?
উত্তর: খাদ্যে মোট ৬টি উপাদান থাকে। যথা- শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং পানি। এগুলোর মধ্যে শর্করা, আমিষ ও স্নেহ পদার্থ দেহ পরিপোষক খাদ্য এবং ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং পানি দেহ সংরক্ষক খাদ্য উপাদান।
১৫. স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রাকৃতিক খাদ্য এবং ফাস্ট ফুডের প্রভাব ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য উপাদেয়। সুষম খাদ্য পিরামিড অনুযায়ী আমাদের এসব প্রাকৃতিক খাদ্য পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। খাবারকে মুখরোচক করার জন্য অতিরিক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে ফাস্ট ফুড উৎপাদন করা হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে প্রাণিজ চর্বি ও চিনি থাকে। এই খাবারগুলো অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বিধায় স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাবে ফেলে।
১৬. প্রতিদিন টাটকা টক জাতীয় খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন কেন?
উত্তর: টাটকা টক জাতীয় খাবারে ভিটামিন ‘সি’ থাকে। ভিটামিন সি-র অভাবে স্কার্ভি রোগ হয়, অস্থির গঠন শক্ত বা মজবুত হতে পারে না, ত্বকে ঘা হয়, ক্ষত শুকাতে দেরি হয়। এছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তাই প্রতিদিন টাটকা টকজাতীয় খাবার খাওয়া প্রয়োজন।
১৭. পানি মানবদেহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: মানবদেহের জন্য পানি অপরিহার্য কেননা আমাদের দৈহিক ওজনের ৬০-৭৫ ভাগই হচ্ছে পানি। অর্থাৎ দেহকোষ গঠন এবং কোষের যাবতীয় শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার জন্য পানির বিকল্প নেই। বিপাকের ফলে দেহে উৎপন্ন বিভিন্ন ক্ষতিকর ও বিষাক্ত পদার্থগুলোকে পানি ঘাম ও মূত্রের মাধ্যমে দেহের বাহিরে বের করে দেয়। তাই মানবদেহের জন্য পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৮. আঁশযুক্ত খাবারের উপকারিতা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: রাফেজ বা আঁশযুক্ত খাবার আমাদের শরীরে কোনো পুষ্টি না জোগালেও এটা পরিপাকে সাহায্য করে। এটি শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমানো এবং ক্ষুধার প্রবণতা কমাতেও সাহায্য করে। এছাড়া রাফেজ জাতীয় খাবার কোষ্ঠকাঠিন্য, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
১৯. লাল আটার রুটি খাওয়া ভালো কেন?
উত্তর: লাল আটার রুটি শরীরের জন্য অধিক উপকারী। গমের তৈরি এই আটা স্বাস্থ্যসম্মত। গমের বাইরের এই বাদামি বা লাল আবরণে ম্যাগনেসিয়াম নামক পুষ্টিকর উপাদান রয়েছে। এই লাল আটাতে আঁশের পরিমাণও বেশি। তাই লাল আটার রুটি খাওয়া ভালো।
২০. উঠতি বয়সের ছেলেমেয়ের স্থূল হয়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড খাওয়ার কারণে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের দেহ স্থূলকায় হয়ে পড়ে। ফাস্ট ফুড বা জাঙ্কফুড এমন একধরনের খাবার যা এর স্বাস্থ্যগত মূল্যের চেয়ে বরং এর মুখোরোচক স্বাদের জন্য উৎপাদন করা হয়। এ ধরনের খাবারে প্রচুর পরিমাণে প্রাণিজ চর্বি ও চিনি থাকে। অধিক পরিমাণে চর্বি জাতীয় খাবার খেলে দেহ এগুলোকে চর্বিকলায় রূপান্তরিত করে। এ কারণে এ ধরনের খাবার খাওয়ার কারণে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের দেহ স্থূলকায় হয়ে পড়ে।
২১. ব্যাকটেরিয়া কীভাবে খাদ্যে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে?
উত্তর: ব্যাকটেরিয়া খাদ্য নষ্ট করে এক ধরনের বিষাক্ত উপাদান উৎপন্ন করে। এই বিষাক্ত উপাদানগুলোকে টক্সিন বলে। এই টক্সিনগুলো যখন খাদ্যে উপস্থিত থাকে তখন তা খাদ্যে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে যা ফুড পয়জনিং নামে পরিচিত।
২২. আম ব্যবসায়ীরা Culter ব্যবহার করেন কেন?
উত্তর: আম দ্রুত পরিপক্ক করতে এবং দীর্ঘদিন গাছে রাখতে আম ব্যবসায়ীরা Culter নামক হরমোন জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ গাছে স্প্রে করে। Culter স্প্রে করলে আম দ্রুত পাকে না এবং গাছে দীর্ঘদিন থাকে।
২৩. ধূমপানের স্বাস্থ্যগত প্রভাব লেখো।
উত্তর: ধূমপান করলে নিকোটিন ছাড়াও শরীরে কিছু বিষাক্ত পদার্থ তৈরী হয়ে শরীরে প্রবেশ করে। ধূমপানের ধোঁয়ায় উল্লেখযোগ্য বিষাক্ত গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থ এবং মাদকদ্রব্যের সংমিশ্রণ থাকে। এই পদার্থগুলো রক্তের হিমোগ্লোবিনের অক্সিজেন বহনক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া কতগুলো আঠালো পদার্থ ও হাইড্রোকার্বন প্রভৃতি এতে থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
২৪. কেউ এইডস আক্রান্ত হলে তা কীভাবে শনাক্ত করা সম্ভব?
উত্তর: এইচআইভি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে রোগীর ওজন দ্রুত হ্রাস পায়। রোগী এক মাস টানা বা থেকে থেকে পাতলা পায়খানায় ভুগবে। তার বার বার জ্বর আসবে ও অতিরিক্ত ঘাম হবে। তার অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভূত হবে। এছাড়াও রোগীর শুকনো কাশি হতে পারে। কারও এ সমস্যাগুলো দেখা গেলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়।
২৫. স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রাকৃতিক খাদ্য এবং ফাস্ট ফুডের প্রভাব ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য উপাদেয়। সুষম খাদ্য পিরামিড অনুযায়ী আমাদের এসব প্রাকৃতিক খাদ্য পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। খাবারকে মুখরোচক থাকে তাদেরকে সুষম খাদ্য বলা হয়। যে কোনো সুষম খাদ্যতালিকায় শর্করা, শাকসবজি, ফলমূল, আমিষ এবং স্নেহ বা চর্বিজাতীয় খাদ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। শর্করা জাতীয় খাবারকে নিচে রেখে পরিমাণ বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে শাক-সবজি, ফলমূল, আমিষ, স্নেহ ও চর্বি জাতীয় খাদ্যকে সাজালে যে কাল্পনিক পিরামিড তৈরি হয় তা-ই আদর্শ খাদ্য পিরামিড।
২৬. খাদ্যে রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহারের শারীরিক প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বর্তমানে খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ যেমন- ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, Ripen, Ethylene প্রভৃতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব বিষাক্ত পদার্থ গ্রহণের ফলে তা পরিপাকের পর সারাদেহে প্রবাহিত হয়। ফলে দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এসকল পদার্থের কারণে বদহজম, পাতলা পায়খানা, পেটের নানা পীড়া, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি এমনকি কিডনি ও লিভার নষ্ট হওয়াসহ মরণঘাতি ক্যান্সারও হতে পারে।
২৭. শরীরে তামাক ও ড্রাগসের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: তামাক ও ড্রাগসের মাধ্যমে শরীরে নানারকম বিষাক্ত গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থ প্রবেশ করে দেহে মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। ক্রমাগত এসব মাদকজাতীয় দ্রব্য সেবনের কারণে মানুষের মধ্যে মাদকাসক্তি দেখা দেয়। মাদকাসক্তির ফলে মানসিক ও শারীরিকভাবে মাদকাসক্ত ব্যক্তি মাদকের ওপর নির্ভর হয়ে পরে। এর ফলে শরীরে বিভিন্ন মারাত্মক রোগ সৃষ্টি হতে পারে এমনকি শেষ পরিণতি হিসেবে মৃত্যুও ঘটতে পারে।
২৮. উদ্ভিজ্জ আমিষের চেয়ে প্রাণীজ আমিষের পুষ্টিগুণ বেশি কেন?
উত্তর: আমিষের প্রধান উপাদান হিসেবে এতে ১৬% নাইট্রোজেন থাকে। দেহে পরিপাকের পর আমিষ অ্যামাইনো এসিডে পরিণত হয়। এই অ্যামাইনো এসিডই আমিষের পুষ্টিগুণ ও মাত্রা ঠিক করে। উদ্ভিজ্জ আমিষের তুলনায় প্রাণিজ আমিষে অ্যামাইনো এসিড বেশি থাকে বলে এর পুষ্টিগুণ বেশি।
২৯. জৈবিক প্রভাবক বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ভিটামিনসমূহ প্রত্যক্ষভাবে দেহ গঠনে অংশ গ্রহণ না করলেও এদের অভাবে দেহের ক্ষয়পূরণ, বৃদ্ধিসাধন বা দেহে তাপ ও শক্তি উৎপাদন ইত্যাদি বিভিন্ন ক্রিয়াগুলো সুসম্পন্ন হতে পারে না। এছাড়া জীবদেহের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপ এদের সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত হয় বলে ভিটামিনসমূহকে জৈবিক প্রভাবক বলে।
৩০. শ্বসন প্রক্রিয়ায় কীভাবে আমরা শক্তি পাই?
উত্তর: নিঃশ্বাস প্রশ্বাস বা শ্বসন প্রক্রিয়ায় আমরা বাতাস থেকে যে অক্সিজেন গ্রহণ করি তা ফুসফুসের মাধ্যমে আমাদের রক্তের সাথে মিশে যায়। রক্তের লোহিত কণিকা এই অক্সিজেনকে আমাদের শরীরের সকল কোষে পৌছে দেয়, সেখানে অক্সিজেন আমাদের গৃহীত খাদ্য গ্লুকোজের সাথে বিক্রিয়া করে তাপশক্তি তৈরি করে। এই তাপশক্তি আমাদের সকল শক্তির উৎস।
৩১. অতিরিক্ত ফাস্টফুড গ্রহণের সাথে স্থূলতার সম্পর্ক কী? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড খাওয়ার কারণে আমাদের দেহ স্থূলকায় হয়ে পড়ে। ফাস্ট ফুড বা জাঙ্কফুড এমন একধরনের খাবার যা এর স্বাস্থ্যগত মূল্যের চেয়ে বরং এর মুখোরোচক স্বাদের জন্য উৎপাদন করা হয়। এ ধরনের খাবারে প্রচুর পরিমাণে প্রাণিজ চর্বি ও চিনি থাকে। অধিক পরিমাণে চর্বি জাতীয় খাবার খেলে দেহ এগুলোকে চর্বিকলায় রূপান্তরিত করে। এ কারণে এ ধরনের খাবার খাওয়ার কারণে আমাদের দেহ স্থূলকায় হয়ে পড়ে।
৩২. ফাস্টফুড খাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করা জরুরি কেন?
উত্তর: ফাস্ট ফুড বা জাঙ্ক ফুডে সাধারণত প্রচুর পরিমাণে প্রাণিজ চর্বি ও চিনি থাকে। আমরা যখন অধিক পরিমাণে জাঙ্ক ফুড খাই, তখন আমাদের দেহ এগুলোকে চর্বিকলায় রূপান্তরিত করে। ফলে দেহ স্থূলকায় হয়ে পড়ে। এছাড়া এতে বিদ্যমান অতিরিক্ত চিনি আমাদের দাঁত ও ত্বককে নষ্ট করে দিতে পারে। এছাড়াও এসব খাদ্যে আমাদের জন্য ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের অভাব রয়েছে। তাই ফাস্ট ফুড বা জাঙ্ক ফুড স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এ কারণে ফাস্টফুড খাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করা জরুরী।
৩৩. এইডস আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু অনিবার্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: AIDS রোগের বাহক হলো অতি ক্ষুদ্র এক বিশেষ ধরনের ভাইরাস। এইডস ভাইরাসকে (Human Immuno Deficiency Virus or HIV) এইচআইভি বলা হয়। এইচআইভি সংক্রমণের সর্বশেষ পর্যায় হলো এইডস। এ ভাইরাস দেহের রোগ প্রতিরোধক কোষকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে দেহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এ রোগের কোনো চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এইডস আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু অনিবার্য।
৩৪. মনের বিশ্রাম কেন প্রয়োজন?
উত্তর: মন থেকে সমস্ত উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, অশান্তি দূর করে দিয়ে পছন্দসই ও স্বস্তিকর কোনো বিষয়ে মনোনিবেশ করাই হলো মনের বিশ্রাম। কঠিন মানসিক পরিশ্রমের পর কর্মান্তর মনের বিশ্রামের একটি উপায়। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে কেবল দেহের নয়, মনেরও বিশ্রামের প্রয়োজন।
৩৫. রক্ত স্থানান্তরের নীতি বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: রক্ত স্থানান্তরের নীতিতে দাতা ও গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ এবং Rh ফ্যাক্টরের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা হয়, যা রক্তের চার ধরনের গ্রুপ অনুযায়ী ‘ABO’ রক্তের শ্রেণিবিভাজন হিসেবে অধিক পরিচিত। ABO সিস্টেম অনুযায়ী দাতার রক্তের অ্যান্টিজেন ও গ্রহীতার অ্যান্টিবডির মধ্যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত নয়।
এছাড়াও রক্ত স্থানান্তরের সময় অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে Rh গ্রহীতা যেন কেবলমাত্র Rh+ দাতার রক্তই গ্রহণ করে।
৩৬. কোলেস্টেরলকে প্রত্যাশিত সীমায় রাখার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: কোলেস্টেরল নির্দিষ্ট সীমার ভিতর রক্তের সাথে মিশে স্নেহের বাহক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু শরীরে প্রয়োজনের বেশি কোলেস্টেরল জমা হলে তা হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়ায়। রক্তের কোলেস্টেরল এর স্বাভাবিক পরিমাণ 200 mg/dl। এর বেশি কোলেস্টেরল এর পরিমাণ হলে রক্তনালীর আন্তঃপ্রাচীরের গায়ে কোলেস্টেরল ও ক্যালসিয়াম জমে গিয়ে রক্তনালির গহ্বর ছোট হয়ে শক্ত হয়ে যায়। যার ফলে নানাবিধ হৃদরোগের দেখা দিতে পারে। এর জন্য রক্তে কোলেস্টেরল সবসময় প্রত্যাশিত সীমার মাঝে রাখা উচিত।
৩৭. রক্ত গ্রহণে প্রয়োজনীয় সতর্কতাগুলো কী কী? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: রক্ত গ্রহণে যেসকল বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে তা হলো-
i. গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ ও দাতার রক্তের গ্রুপের সামাঞ্জস্যতা (ABO ও Rh ফ্যাক্টর) নিশ্চিত করা।
ii. রক্ত স্থানান্তরের আগে দাতার রক্ত ও গ্রহীতার রক্ত একসাথে মিশিয়ে ক্রস ম্যাচিং করা।
৩৮. রক্তের উপাদান ব্যাখ্যাসহ এদের দুটি কাজ লেখো।
উত্তর: রক্ত একধরনের লাল বর্ণের অস্বচ্ছ, আন্তঃকোষীয় লবণাক্ত ক্ষারধর্মী তরল যোজক টিস্যু। রক্তের প্রধান উপাদান হচ্ছে রক্তরস বা প্লাজমা এবং রক্তকোষ। মানবদেহের সমগ্র রক্তের প্রায় ৫৫% রক্তরস এবং বাকি ৪৫% রক্তকোষ। রক্তরসকে আলাদা করলে এটি হালকা হলুদ বর্ণের দেখায় এবং রক্তকোষগুলো এই রক্তরসে ভাসমান থাকে। রক্তের উপাদানের দুটি কাজ নিচে উল্লেখ করা হলো-
i. রক্তরস রক্তের অম্ল ক্ষারের ভারসাম্য রক্ষা করে।
ii. লোহিত রক্তকোষ হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে ফুসফুস থেকে সমগ্র দেহের কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।
৩৯. রক্তের গ্রুপের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: রক্তের গ্রুপ লোহিত রক্তকোষের পৃষ্ঠে থাকা অ্যান্টিজেন এবং প্লাজমায় থাকা অ্যান্টিবডির উপস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। ABO সিস্টেমে A, B, AB এবং ০ চার ধরনের রক্তগ্রুপ থাকে। যেখানে A ও B অ্যান্টিজেন এবং অ্যান্টিবডি A ও অ্যান্টিবডি B গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও এই চার ধরনের রক্তে রেসাস ফ্যাক্টরের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির উপর ভিত্তি করে যথাক্রমে Rh+ ও Rh এ ভাগ করা হয়ে থাকে। রেসাস ফ্যাক্টর (Rh) এর জন্য আমরা মানুষের রক্তের পজেটিভ ও নেগেটিভ ব্লাডগ্রুপ দেখে থাকি।
৪০. রক্তের বিঘ্নতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণ এবং তার ফলাফল ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: রক্তের বিঘ্নতা বা বিশৃঙ্খলা তখনই ঘটে যখন রক্তের গ্রুপ বা Rh ফ্যাক্টরের মাঝে অসামঞ্জস্যতা থাকে। ভুল গ্রুপের রক্ত গ্রহীতার দেহে প্রবেশ করানো হলে তা গ্রহীতার শরীরের অভ্যন্তরের ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করে তোলে যার ফলে তা ভিন্নগ্রুপের রক্তের কোষ ধ্বংস করে শরীরের অভ্যন্তরের রক্তের কোষগুলোকে জমিয়ে দিতে থাকে। যা অ্যাপ্লুটিনেশন নামে পরিচিত এবং অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি বিক্রিয়ার ফলে ঘটে থাকে।
৪১. শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: শরীরে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়াটি হৃদপিন্ড থেকে শুরু হয়, যা রক্তকে শিরা ও ধমনীর মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে পাঠায়। রক্তের মাধ্যমে শরীরে বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান সরবরাহ হয়ে থাকে, কোষে উৎপন্ন বর্জ্য পদার্থ পুনরায় রক্তের সাথে মিশে হৃদপিন্ডে ফিরে আসে এবং শ্বসনতন্ত্র তথা ফুসফুসের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করে পুনরায় সঞ্চালিত হয়।
৪২. রক্তচাপজনিত শারীরিক সমস্যা প্রতিরোধের তিনটি কৌশল লেখো
উত্তর: রক্তচাপজনিত শারীরিক সমস্যা প্রতিরোধের তিনটি উপায় হলো-
i. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা।
ii. দেহের ওজন না বাড়ানো এবং
iii. সুষম খাদ্য নিয়মিত গ্রহণ করা।
৪৩. পালস রেটের সাথে হৃদপিণ্ডের সুস্থতার সম্পর্ক কী?
উত্তর: হাতের রেডিয়াল ধমনি এক মিনিটে কতবার স্পন্দিত হচ্ছে, সেটিই হচ্ছে পালস রেট। স্বাভাবিক পালস রেট হলো প্রতি মিনিটে ৬০-১০০ বার। পরিশ্রম করলে, ঘাবড়ে গেলে, জ্বর হলে বা তীব্র যন্ত্রণা হলে পালস রেট বেড়ে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় পালসের গতি খুব দ্রুত, খুব মন্থর বা অনিয়ন্ত্রিত হলে বুঝতে হবে হৃৎপিণ্ডে সমস্যা হয়েছে। হার্ট ব্লক বা জন্ডিসের কারণে প্রতি মিনিটে পালস রেট ৬০ এর কম হতে পারে।
৪৪. রক্ত সঞ্চালনে শরীরে কোলেস্টেরলের ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে রক্ত সঞ্চালন বিঘ্নিত হয়। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রার কোলেস্টেরল হলে, রক্তনালির অন্তঃপ্রাচীরে তা জমা হয়ে রক্তনালির গহ্বর গেট হয়ে যায়। এতে ধমনিতে ফাটল হয়ে রক্ত চলাচল বিঘ্নিত হয়। রক্ত জমাট বেঁধে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুও হতে পারে।
৪৫. রক্তরস বা প্লাজমা বলতে কী বোঝ? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: রক্তের তরল অংশকে প্লাজমা বা রক্তরস বলা হয় যা রক্তের মোট আয়তনের ৫৫% জুড়ে থাকে। রক্তরসের প্রায় ৯০% পানি এবং বাকি ১০% এ বিভিন্ন ধরনের জৈব, অজৈব ও গ্যাসীয় উপাদান দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। রক্তরসের প্রধান কাজ হচ্ছে রক্তকোষগুলোকে পরিবহন করা এবং শরীরের বিভিন্ন কোষে পুষ্টি ও অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া।
৪৬. এরিথ্রোসাইট বা লোহিত রক্তকোষের বর্ণ লাল হয় কেন? বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: মানবদেহের পরিণত লোহিত রক্তকোষ দ্বি-অবতল এবং চাকতির ন্যায় যাতে হিমোগ্লোবিন নামক রঞ্জক পদার্থ থাকে। অন্যভাবে বলা যায়, লোহিত রক্তকোষ হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে হিমোগ্লোবিন ভর্তি চ্যাপ্টা আকৃতির ভাসমান ব্যাগ। লোহিত রক্তকোষের এই হিমোগ্লোবিন নামক লৌহঘটিত রঞ্জক রক্তের অক্সিজেনের সাথে মিশে অক্সিহিমোগ্লোবিন তৈরি করে যা লাল বর্ণের হয়ে থাকে। এ কারণেই লোহিত রক্তকোষ বা এরিথ্রোসাইট লাল দেখায়।
৪৭. শ্বেতকোষ কীভাবে ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু ধ্বংস করে তা বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: ফ্যাগোসাইটোসিস হলো একটি প্রক্রিয়া যেখানে শ্বেতরক্তকোষ ক্ষতিকর জীবাণু কণাকে নিজের ভিতরে গ্রহণ করে তা ধ্বংস করে। অ্যামিবা এর মতো শ্বেতরক্তকোষ এর আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে। শ্বেত রক্তকোষগুলো জীবাণু চিহ্নিত করে তার দিকে আকৃষ্ট হয়। এরপর এটি জীবাণুকে ঘিরে ফ্যাগোসম তৈরি করে যার ভিতরের এসিডিক পরিবেশ জীবাণুকে ধ্বংস করে এবং তা শরীর থেকে অপসারণ করে। এটি মানবদেহের শরীরের প্রতিরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৪৮. রক্তবাহিকায় রক্তজমাট না বাঁধার দুটি কারণ লেখো।
উত্তর: নিম্নলিখিত কারণ এর ফলস্বরূপ রক্তবাহিকায় রক্তজমাট বাঁধে না-
i. রক্তবাহিকার অভ্যন্তর দিয়ে অনবরত রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে।
ii. বেসোফিল ও হেপারিন নিঃসৃত করে রক্তকে রক্তনালী বা রক্তবাহিকার ভেতর জমাট বাঁধতে বাধা দেয়।
৪৯. অণুচক্রিকা বলতে কী বোঝ তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: অণুচক্রিকা বা থ্রোম্বোসাইট হলো রক্তের ছোট কোষ যা রক্তে থাকে এবং রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সাহায্য করে। এ ধরনের রক্তকোষ হাড়ের মজ্জায় তৈরি হয় এবং ক্ষতস্থানে জমা হয়ে রক্তজমাট বাঁধে; ফলে রক্তপাত বন্ধ হয়। অণুচক্রিকাগুলোর গড় আয়ু ৫-১০ দিন এবং মানবদেহে প্রতি ঘনমিলিমিটারে প্রায় দেড় থেকে সাড়ে চার লাখ অণুচক্রিকা থাকে।
৫০. অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি এর দুটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর: অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডির দুটি পার্থক্য হলো-
| অ্যান্টিজেন | অ্যান্টিবডি |
|---|---|
| ১. বহিরাগত প্রোটিন, যা রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করে তাকে অ্যান্টিজেন বলে। | ১. রক্তকোষ কর্তৃক সৃষ্ট রাসায়নিক পদার্থ যা অ্যান্টিজেনকে প্রতিহত করে তাকে অ্যান্টিবডি বলে। |
| ২. অ্যান্টিজেনকে অ্যাপ্লুটিনোজেন বলা হয়। | ২. অ্যান্টিবডিকে অ্যান্ড্রুটিনিন বলে। |
৫১. কোন রক্তের দ্রবণে অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি একসাথে থাকলে রক্তের কোষগুলো গুচ্ছবদ্ধ হয়ে পরে কেন?
উত্তর: রক্তের দ্রবণে অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি একসাথে থাকলে এগ্লুটিনেশন প্রক্রিয়ায় রক্তকোষগুলো গুচ্ছবদ্ধ হয়ে যায়। অ্যান্টিবডি একইসাথে একাধিক অ্যান্টিজেন এর সাথে যুক্ত হয়ে বিক্রিয়া করতে পারে যাকে অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডির বিক্রিয়া বলা যায়। অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডির এই বিক্রিয়ার ফলে রক্তকোষগুলোর মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি হয় এবং তা গুচ্ছবদ্ধ হয়ে যেতে শুরু করে।
৫২. বিয়ের ক্ষেত্রে বর ও কনে এর Rh ফ্যাক্টর একই হওয়া প্রয়োজন কেন? বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: সন্তানসম্ভবা মায়েদের ক্ষেত্রে Rh ফ্যাক্টর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। Rh ফ্যাক্টরের মধ্যে Rh+ ফ্যাক্টরটি Rh– ফ্যাক্টরের উপর প্রকট। অর্থাৎ যদি মা Rh নেগেটিভ (Rh–) রক্তধারী হয় এবং বাবা Rh+ রক্তধারী হয় তখন প্রথম সন্তান গ্রহণের সময় মায়ের গর্ভের শিশুটি যদি Rh+ রক্তধারী হয় তখন সেই Rh+ রক্তধারী শিশুটিকে মায়ের শরীর অ্যান্টিজেন হিসেবে গণ্য করে থাকে এবং তার বিপক্ষে অ্যান্টিবডি তৈরি করে থাকে। প্রথম সন্তান সুস্থভাবে জন্ম নিলেও পরবর্তীতে গর্ভধারণ এর সময় মায়ের শরীরের অ্যান্টিবডি একই ধরনের ভ্রূণের লোহিত কণিকা ধ্বংস হয় এবং ভ্রূণ বিনষ্ট করে ফেলে। তাই বিয়ের সময় বর ও কনের Rh ফ্যাক্টর একই হওয়া প্রয়োজন এবং তা যাচাই করে নেওয়া উচিৎ।
৫৩. মানুষের হৃৎপিণ্ডকে মায়োজেনিক বলা হয় কেন?
উত্তর: হার্টবিট একটি জটিল প্রক্রিয়া। মানুষের হৃৎপিণ্ডের হৃদপেশি বাইরের কোন উদ্দীপনা ছাড়াই নিজ থেকে সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে হৃদস্পন্দন সৃষ্টি করতে পারে। তাই মানুষের হৃদপিণ্ডকে মায়োজেনিক বলা হয়।
৫৪. হৃদযন্ত্রকে ভালো রাখার চারটি উপায় লেখো।
উত্তর: হৃদযন্ত্রকে ভালো রাখার চারটি উপায় নিচে উল্লেখ করা হলো-
i. দেহের উচ্চতা ও বয়স অনুযায়ী ওজন ঠিক রাখা।
ii. প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন মিশ্রিত খাবার খাওয়া।
iii. শর্করা, মিষ্টি ও স্নেহজাতীয় খাদ্যের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা ও বেশি বেশি আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া। এবং
iv. উদ্ভিজ্জ তেল ও সামুদ্রিক মাছ বেশি বেশি গ্রহণ করা। কেননা মাছভোজীদের হৃদরোগের প্রকোপ কম দেখা দেয়।
৫৫. রক্তের অজৈব উপাদান বলতে কী বোঝ? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: রক্তের তরল অংশ হচ্ছে প্লাজমা যাতে প্রয়োজনীয় সকল জৈব ও অজৈব উপাদান দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। রক্তে বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের খনিজ পদার্থের আয়ন যেমন: সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, লৌহ, আয়োডিন ও ক্যালসিয়াম এবং গ্যাসীয় পদার্থ O₂, CO₂ এবং N₂ ইত্যাদিকে রক্তের অজৈব উপাদান বলা হয়।
৫৬. সিরাম বলতে কী বোঝ? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: রক্ত থেকে রক্তকোষ এবং রক্তজমাট বাঁধার জন্য যে প্রয়োজনীয় প্রোটিন আছে, সেটাকে সরিয়ে দেওয়ার পর যে তরলটি রয়ে যায়, তাকে সিরাম বলে। অন্যভাবে বলা যায়, রক্তজমাট বাঁধার পর যে স্বচ্ছ রস পাওয়া যায়, তাকে সিরাম বলে। রক্তরস বা প্লাজমা এবং সিরামের মাঝে পার্থক্য হলো রক্তরসে রক্তজমাট বাঁধার প্রয়োজনীয় প্রোটিন থাকে কিন্তু সিরামে থাকে না।
৫৭. লোহিত রক্তকোষ কী? বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: লোহিত রক্তকোষ হলো রক্তের একটি প্রধান কোষীয় উপাদান যা হিমোগ্লোবিন নামক প্রোটিন ধারণ করে। মানবদেহে পরিণত লোহিত রক্তকোষ দ্বি-অবতল এবং চাকতির ন্যায়। এ কোষগুলি সার্বক্ষণিকভাবেই অস্থিমজ্জা হতে উৎপন্ন হয়। মানুষের লোহিত রক্তকোষের গড় আয়ু ১২০ দিন।
৫৮. লিম্ফোসাইট ও মনোসাইট এর দুটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর:
| লিম্ফোসাইট | মনোসাইট |
|---|---|
| ১. লিম্ফোসাইট হচ্ছে বড় নিউক্লিয়াসযুক্ত ছোট কোষ। | ১. মনোসাইট হচ্ছে ছোট, ডিম্বাকার বৃক্কাকার নিউক্লিয়াসবিশিষ্ট বড় কোষ। |
| ২. লিম্ফোসাইট অ্যান্টিবডি তৈরি করে রোগজীবাণু ধ্বংস করে। | ২. মনোসাইট ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় রোগজীবাণু ধ্বংস করে। |
৫৯. লিউকেমিয়া হওয়ার কারণ কী? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মানব শরীরে কোনো রোগ জীবাণু প্রবেশ করলে স্বাভাবিক ভাবেই শ্বেত রক্তকোষের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে যায় যা পরবর্তীতে পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এক সুস্থ মানুষের দেহে শ্বেত রক্তকোষের স্বাভাবিক সংখ্যা হচ্ছে ৪ থেকে ১০ হাজার। কিন্তু যদি রক্তে শ্বেত রক্তকোষের সংখ্যা স্বাভাবিকের চাইতে অধিকমাত্রায় বাড়তে থাকে এবং তা অন্যান্য রক্তকোষের স্বাভাবিক কাজকে বাধাগ্রস্ত করে তখন তাকে লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সার বলে। এর অনেক ধরণ রয়েছে যা অনেকাংশেই নিরাময়যোগ্য।
৬০. অ্যান্টিজেন বলতে কী বোঝ? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: অ্যান্টিজেন হচ্ছে বহিরাগত কোনো বস্তু বা প্রোটিন যেটি আমাদের শরীরে প্রবেশ করলে আমাদের শরীরের নিরাপত্তাব্যবস্থা তথা ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করে এবং শরীরে এন্টিবডি তৈরি করে। এটি শরীরের বাইরের ক্ষতিকারক জীবাণু (ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস) অথবা পরিবেশগত উপাদান (ধূলিকণা, পরাগরেণু) থেকেও শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
৬১. ০ রক্তের গ্রুপকে সর্বজনীন দাতা বা Universal donor বলা হয় কেন?
উত্তর: যে ব্লাড গ্রুপভুক্ত ব্যক্তি নিজের রক্ত অন্যসব ব্লাড গ্রুপবিশিষ্ট ব্যক্তিকে দিতে পারে তাকে সর্বজনীন দাতা বলা হয়। ০ গ্রুপের রক্তের লোহিত কণিকায় যেহেতু কোন অ্যান্টিজেন নেই তাই এরা ‘A’, ‘B’, ‘AB’ ও ‘০’ বিশিষ্ট যেকোন গ্রুপকেই সহজে রক্ত দিতে পারে। এতে সেই গ্রুপের রক্ত গ্রহিতার কোনই ক্ষতি হবে না। এজন্য ০ গ্রুপধারী ব্যক্তিকে ইউনির্ভাসাল ডোনার বলা হয়।
৬২. রক্তের গ্রুপ না জেনে কাউকে রক্ত দেওয়া ঠিক নয় কেন?
উত্তর: রক্তের গ্রুপ না জেনে কাউকে রক্ত দিলে যদি গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ ও তার রক্তের গ্রুপ একই না হয় তাহলে রক্তের কোষের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি-অ্যান্টিজেন বিক্রিয়ার ফলে রক্তের কণিকাগুলো গুচ্ছবদ্ধ হয়ে যায়। এর ফলে সেই ব্যক্তির মৃত্যুও ঘটতে পারে। এ কারণে রক্তের গ্রুপ না জেনে কাউকে রক্ত দেওয়া ঠিক নয়।
৬৩. ধমনি ও শিরার মধ্যে ৪টি পার্থক্য লেখো।
উত্তর: ধমনি ও শিরার মধ্যে ৪টি পার্থক্য নিচে দেওয়া হলো-
| ধমনি | শিরা |
|---|---|
| i. ধমনির মাধ্যমে হৃৎপিণ্ড হতে রক্ত দেহের বিভিন্ন অঙ্গে পৌছায়। | i. শিরার মাধ্যমে রক্ত দেহের বিভিন্ন অঙ্গ হতে হৃৎপিন্ডে আসে। |
| ii. ধমনির প্রাচীর পুরু। | ii. শিরার প্রাচীর পাতলা। |
| iii. ধমনির গহ্বর ছোট। | iii. শিরার গহ্বর বড়। |
| iv. কপাটিকা থাকে না। | iv. কপাটিকা থাকে। |
৬৪. হার্ট ফেইলিউর বলতে কী বোঝ?
উত্তর: হৃৎপিন্ডের অ্যাট্রিয়াম অথবা ভেন্ট্রিকল অথবা উভয়ের সংকোচন ক্ষমতা লোপ পাওয়াকে বলা হয় হার্ট ফেইলিউর। হৃদপিন্ড যখন শরীরের চাহিদা অনুযায়ী রক্ত সংবহন বজায় রাখবার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পাম্প করতে পারে না, তখনই হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়।
৬৫. কোন ধরনের লোকের ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি?
উত্তর: যে কেউ যেকোনো ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারে। তবে চার ধরনের মানুষের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। যথা-
i. যাদের বংশে ডায়াবেটিস আছে; ii. যাদের ওজন বেশি এবং শরীর মেদবহুল; iii. যারা ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম করে না এবং iv. যারা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করে।
৬৬. রক্ত বলতে কী বোঝায় তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: রক্ত এক ধরনের লাল বর্ণের অস্বচ্ছ, আন্তঃকোষীয় লবণাক্ত এবং খানিকটা ক্ষারধর্মী তরল যোজক টিস্যু। একজন পূর্ণবয়স্ক সুস্থ মানুষের দেহে ৫-৬ লিটার রক্ত থাকে যা মোট ওজনের ৮%। রক্ত মূলত রক্তরস এবং রক্তকোষ নিয়ে গঠিত। মানুষ এবং অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীদের রক্তের রং লাল হয়ে থাকে। রক্তে উপস্থিত হিমোগ্লোবিন নামক লৌহ ঘটিত প্রোটিনের জন্যই রক্তের রং লাল হয়।
৬৭. শরীরে কীভাবে রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন বাহিত হয়? বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: রক্তে লাল রঙের হিমোগ্লোবিন নামক লৌহঘটিত প্রোটিন জাতীয় পদার্থ থাকে। এটি যেমন রক্তের রং লাল করে একইভাবে এই হিমোগ্লোবিন অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে অক্সিহিমোগ্লোবিন যৌগ গঠন করে। এই গঠিত অক্সিহিমোগ্লোবিন নামক যৌগই আমাদের সমগ্র দেহে অক্সিজেন বহন করে নিয়ে যায়।
৬৮. রক্তকোষ বলতে কী বোঝায় তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: রক্তরসের মধ্যে ছড়ানো বিভিন্ন রকমের কোষকে রক্তকোষ বলে। সমগ্র রক্তের মোট আয়তনের ৪৫% হচ্ছে রক্তকোষ। রক্তকোষগুলোতে তিন ধরনের কোষীয় উপাদান থাকে যথা লোহিত রক্তকোষ (এরিথ্রোসাইট), শ্বেতরক্তকোষ বা লিউকোসাইট এবং অনুচক্রিকা বা থ্রোম্বোসাইট। রক্তকোষের এসকল কোষীয় উপাদান রক্তের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে থাকে।
৬৯. মানব শরীরের লাল বর্ণের রক্তকোষটি অধিক অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে কেন তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মানবদেহের লাল বর্ণের রক্তকোষটি হলো লোহিত রক্তকোষ বা এরিথ্রোসাইট। এতে হিমোগ্লোবিন নামক লৌহঘটিত রঞ্জক পদার্থের উপস্থিতির ফলস্বরূপ এটি লাল বর্ণের হয়। আর এই হিমোগ্লোবিনের উপস্থিতির জন্য কেবলমাত্র লোহিত রক্তকোষ অধিক পরিমাণে অক্সিজেন পরিবহন করতে পারে। হিমোগ্লোবিন অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে অক্সিহিমোগ্লোবিন নামক যৌগ গঠন করে। এই যৌগের মাধ্যমে অক্সিজেন সমগ্র দেহে সরবরাহ হয়।
৭০. মানবদেহের কোনো অংশ কেটে গেলে রক্তজমাট বাঁধার কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মানবদেহে যখন কোনো রক্তবাহিকা বা কোনো টিস্যু আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে কেটে যায়, তখন সেই স্থানের অণুচক্রিকাগুলো ভেঙে যায় এবং থ্রোম্বোপ্লাস্টিন নামক পদার্থ সৃষ্টি করে। এ পদার্থগুলো রক্তের প্রোটিন প্রোথ্রমবিনকে থ্রমবিনে পরিণত করে। থ্রমবিন পরবর্তীতে রক্তরসের প্রোটিন-ফাইব্রিনোজেনকে ফাইব্রিন জালকে পরিণত করে রক্তের তঞ্চন ঘটায়। ফাইব্রিন একধরণের অদ্রবণীয় প্রোটিন, যা দ্রুত সুতার মতো জালিকা প্রস্তুত করে। এটি ক্ষতস্থানে জমাট বাঁধে এবং রক্তক্ষরণ বন্ধ করে।
৭১. অ্যান্টিবডি বলতে কী বোঝ? তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: অ্যান্টিবডি হলো একটি প্রোটিন যা শরীরের ইমিউন সিস্টেম দ্বারা অ্যান্টিজেন এর আক্রমণ এর ফলে সৃষ্টি হয়। এটি শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশকৃত ক্ষতিকারক এন্টিজেন এর বিরুদ্ধে কাজ করে এবং তাদের নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করে। অ্যান্টিবডি আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৭২. “হৃদপিণ্ড মানবদেহে পাম্পের ন্যায় কাজ করে”- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: একটি পাম্প মেশিন যেমন কতকগুলো কপাটিকা বা ভালব কাজে লাগিয়ে তরল, বা গ্যাস সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনিভাবে একটি হৃৎপিণ্ডও অবিরামভাবে সংকুচিত বা প্রসারিত হয়ে দেহের অভ্যন্তরে রক্ত সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এ কারণে হৃৎপিণ্ডকে পাম্পযন্ত্রের সাথে তুলনা করা হয়।
৭৩. পালসরেট গণনা করার পদ্ধতি বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: পালসরেট গণনার ক্ষেত্রে প্রথমে রোগীর হাতের কবজিতে হাতের তিন আঙ্গুল যেমন অনামিকা, মধ্যমা ও তর্জনী দিয়ে চাপ দিয়ে হৃৎস্পন্দন প্রতি মিনিটে কতবার হয় তা অনুভব করতে হবে। এরপর হাতের তিন আঙুল এমনভাবে রাখতে হবে যাতে তর্জনী থাকে হৃৎপিন্ডের দিকে, মধ্যমা মাঝখানে এবং অনামিকা হাতের আঙুলের দিকে। এবার এক মিনিটে মধ্যমা আঙুল দিয়ে বোঝা যাবে হাতের রেডিয়াল ধমনি কত বার ধুকধুক করছে। এটাই পালসরেট বা পালসের গতি। আর এভাবেই পালসরেট গণনা করা যায়।
৭৪. হার্ট অ্যাটাক কেন হয় বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: হৃৎপিণ্ডের করোনারি ধমনি বন্ধ হয়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক হয়। করোনারি ধমনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে হৃৎপেশির রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। যা হার্ট অ্যাটাকের সৃষ্টি করে।
৭৫. শ্বেত রক্তকোষ বলতে কী বোঝ তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: শ্বেত রক্তকোষ বা White Blood Cell (WBC) হলো রক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ কোষীয় উপাদান; যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলো রক্তের তরল অংশ প্লাজমায় থাকে এবং রক্তের অনুপ্রবেশকারী ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও অন্যান্য রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে। শ্বেত রক্তকোষের সংখ্যা লোহিত রক্তকোষের তুলনায় অনেক কম।
৭৬. গ্রানুলোসাইট ও অ্যাগ্রানুলোসাইট এর দুটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর:
| গ্রানুলোসাইট | অ্যাগ্রানুলোসাইট |
|---|---|
| ১. এদের সাইটোপ্লাজম সূক্ষ্ম দানাযুক্ত। | ১. এদের সাইটোপ্লাজম দানাহীন ও স্বচ্ছ। |
| ২. গ্রানুলোসাইটের শ্বেতকোষগুলি তিন প্রকার যথা- i. ইওসিনোফিল; ii. নিউট্রোফিল ও iii. বেসোফিল। | ২. অ্যাগ্রানুলোসাইট শ্বেতকোষগুলি দুই প্রকার। i. লিম্ফোসাইট ii. মনোসাইট। |
৭৭. রক্ত কীভাবে রোগ প্রতিরোধ করে তা বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: শরীরে রোগজীবাণু প্রবেশ করলে রক্তের মনোসাইট ও নিউট্রোফিলজাতীয় শ্বেতরক্তকোষ ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে জীবাণুকে গ্রাস করে ধ্বংস করে। রক্তের শ্বেতরক্ত কোষের লিম্ফোসাইট কোষ অ্যান্টিবডি গঠন করে দেহের অভ্যন্তরের জীবাণুকে ধ্বংস করে। এছাড়াও এটি বাইরে থেকে আগত জীবাণুর আক্রমণকেও প্রতিহত করে।
৭৮. থ্রম্বোসাইটোসিস বলতে কী বোঝ তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মানব শরীরে অণুচক্রিকা এর স্বাভাবিক সংখ্যা হচ্ছে প্রায় দেড় থেকে সাড়ে চার লাখ। কিন্তু কোনো কারণবশত যদি এই সংখ্যা স্বাভাবিক এর তুলনায় অনেকাংশে বেড়ে যায় তখন তার ফলে সৃষ্ট রোগকে থ্রম্বোসাইটোসিস বলে। যদি হৃৎপিন্ডের করোনারি রক্তনালির রক্তজমাট বাঁধলে তাকে করোনারি থ্রম্বসিস বলা হয়। একইভাবে গুরু মস্তিষ্কের রক্তনালিকায় রক্ত জমাট বাঁধলে তাকে সেরিব্রাল থ্রম্বোসিস বলে।
৭৯. কোন ব্যক্তির রক্তে একই ধরনের অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি থাকতে পারে কী? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: একজন মানুষের রক্তের লোহিত কোষে একই সাথে একই ধরনের অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি উপস্থিত থাকতে পারে না। রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ হয় রক্তের পৃষ্ঠে থাকা অ্যান্টিজেন ও প্লাজমার অ্যান্টিবডির ভিত্তিতে। যদি একই ধরনের অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি একসাথে উপস্থিত থাকে, তাহলে তারা পরস্পর প্রতিক্রিয়া করে রক্তের কোষ ধ্বংস বা জমাট বাঁধতে পারে যাকে অ্যাপ্লুটিনেশন বিক্রিয়া বলে। এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।
৮০. AB গ্রুপধারী ব্যক্তিকে সর্বজনীন গ্রহীতা বলা হয় কেন?
উত্তর: রক্তের যে গ্রুপ অন্য যেকোনো গ্রুপবিশিষ্ট রক্ত গ্রহণ করতে পারে তাদেরকে ‘Universal Acceptor’ বা সর্বজনীন গ্রহীতা বলা হয়। AB রক্তধারী ব্যক্তির রক্তের প্লাজমায় কোন অ্যান্টিবডি থাকে না যার ফলে A ও B রক্তের গ্রুপের অ্যান্টিজেন গ্রহীতার AB রক্তের সাথে কোন ধরনের বিক্রিয়া করে না। এ কারণে AB গ্রুপের রক্তধারী ব্যক্তি ‘A’, ‘B’, ‘AB’ এবং ‘O’ সকল গ্রুপের রক্ত গ্রহণ করতে পারে। তাই AB গ্রুপের ব্যক্তিদের Universal Acceptor বা সর্বজনীন গ্রহীতা বলা হয়।
৮১. উচ্চ রক্তচাপ বলতে কী বোঝ? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: শরীর ও মনের স্বাভাবিক অবস্থায় রক্তচাপ যদি বয়সের জন্য নির্ধারিত মাত্রার উপরে অবস্থান করতে থাকে তবে তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপার টেনশন বলে। হৃৎপিন্ডের সংকোচন ও প্রসারণের ফলে হৃৎপিণ্ডের থেকে ধমনীতে রক্ত প্রবাহকালে যদি কোন ব্যক্তির সিস্টোলিক রক্তচাপ সবসময় ১৬০ মি.মি. পারদস্তম্ভ এবং ডায়াস্টোলিক সব সময় ৯০ মি. মি. পারদস্তম্ভ বা তার বেশি থাকে, তবে তার উচ্চরক্তচাপ বা হাইপার টেনশন আছে বলা যায়।
৮২. উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণগুলো লেখো।
উত্তর: মাথা ব্যথা, বিশেষ করে মাথার পেছন দিকে ব্যথা করা উচ্চ রক্তচাপের প্রাথমিক লক্ষণ। এছাড়াও রোগীর মাথা ঘোরা, ঘাড় ব্যথা করা, বুক ধড়ফড় করা ও দুর্বল বোধ করা উচ্চ রক্তচাপের লক্ষ। অনেক সময় রোগীর নাক দিয়ে রক্ত পড়ে। আবার উচ্চ রক্ত চাপের রোগীর সুনিদ্রা হয় না এবং অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠে।
৮৩. উচ্চ রক্তচাপ হার্ট অ্যাটাকের কারণ- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম কারণ হলো উচ্চ রক্তচাপ। অতিরিক্ত উচ্চ রক্তচাপের প্রভাবে সৃষ্ট চাপের দ্বারা হৃৎপিণ্ডের করোনারি ধমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রক্ত চলাচল মন্থর হয়ে যায়। ধমনিতে চর্বি, কোলেস্টেরল ও অন্যান্য পদার্থ জমে রক্ত চলাচলের পথকে সংকীর্ণ করে দেয়। এসব পদার্থ জমে বা রক্ত জমাট বেঁধে ধমনি বন্ধ হয়ে গেলে হৃদপেশিতে রক্ত সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হার্ট অ্যাটাক হয়।
৮৪. রক্তে কোলেস্টেরলের আধিক্য মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কেন?
উত্তর: রক্তে কোলেস্টেরলের স্বাভাবিক মাত্রা ১০০-২০০ mg/dL। এ মাত্রা থেকে রক্তে কোলেস্টেরল বেশি হলে রক্ত নালির আন্তঃপ্রাচীর গাত্রে কোলেস্টেরল ও ক্যালসিয়াম জমা হয়ে রক্তনালী গহ্বর সংকুচিত হয়। ফলে ধমনীর প্রাচীরের স্থিতিস্থাপকতা কমে যায় এবং শক্ত হয়ে ফাটল তৈরি হয়। যা হৃদরোগের প্রধান কারণ।
৮৫. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রোগীকে কী কী জীবন শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে লেখো।
উত্তর: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে যেসব জীবন শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয় সেগুলো হলো-
i. নিয়মিত ও পরিমাণমতো ব্যায়াম করতে হবে।
ii. নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ পরিমাপ করে এবং ফলাফল লিখে রাখতে হবে।
iii. নিয়মিত ও পরিমাণমতো সুষম খাবার খেতে হবে।
৮৬. পাকস্থলীর এসিডিটি থেকে রক্ষা পেতে সঠিক খাদ্য নির্বাচন জরুরি- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: খালি পেটে বা মাত্রাতিরিক্ত ফলের জুস, চা, কফি পান করলে, ভাজা-পোড়া, তেল-চর্বিজাতীয় খাদ্য, মসলাদার খাদ্য, চকলেট ইত্যাদি বেশি খেলে পাকস্থলীতে এসিডিটি হয়, তাই এগুলো অতিরিক্ত গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ক্ষারধর্মী খাবার ও পানীয় গ্রহণের মাধ্যমে এসিডিটি কমানো যেতে পারে। যেমন- ব্রকলি, পুঁইশাক; খেজুর, পেঁপে; সয়া দুধ, বাদাম দুধ; সবুজ চা, আদা চা ইত্যাদি। তাই পাকস্থলীর এসিডিটি থেকে রক্ষা পেতে সঠিক খাদ্য নির্বাচন জরুরি।
৮৭. পদার্থের pH এর মান জানা প্রয়োজন কেন?
উত্তর: pH এর মানের সাহায্যে কোনো পদার্থের জলীয় দ্রবণ অম্লীয়, ক্ষারীয় নাকি নিরপেক্ষ তা জানা যায়। মাটির এসিডিটি বা ক্ষারকত্ব দূর করতে, বিভিন্ন প্রসাধনী দ্রব্য তৈরি করতে ও স্বাস্থ্যসুরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে pH এর মান জানার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এছাড়া শিল্প কারখানায় বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত দ্রব্য উৎপাদনের জন্য pH এর নির্দিষ্ট মান নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। এ সকল কারণে পদার্থের pH এর মান জানা প্রয়োজন।
৮৮. আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে অম্ল, ক্ষার ও লবণের অবদান ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: দৈনিন্দিন জীবনে অম্ল, ক্ষার ও লবণের অবদান অনস্বীকার্য। আমাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় নানারকম দ্রব্যসামগ্রী, খাবার, পরিষ্কারক, ওষুধ ইত্যাদিতে এগুলোর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। কৃষি জমিতে ভালো ফসল উৎপাদনের জন্য এবং বিভিন্ন শিল্প কারখানায় এগুলো প্রচুর পরিমাণ ব্যবহৃত হয়। কিছু ক্ষতিকর দিক থাকলেও অম্ল, ক্ষার ও লবণ জাতীয় যৌগ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের নানা কার্যাবলির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
৮৯. অজৈব এসিড হওয়া সত্ত্বেও H₂CO₃ কে দুর্বল এসিড বলা হয় কেন?
উত্তর: H₂CO₃ একটি অজৈব এসিড। এটি জলীয় দ্রবণে বিয়োজিত হয়ে (H+) আয়ন দেয়। তাই H₂CO₃ কে এসিড বলা হয়। তবে H₂CO₃ বা কার্বোনিক এসিড জলীয় দ্রবণে সম্পূর্ণ বিয়োজিত হয় না। তাই অজৈব এসিড হওয়া সত্ত্বেও এটিকে দুর্বল এসিড বলা হয়।
৯০. মাংস, পোলাও, বিরিয়ানি ইত্যাদি গুরুপাক খাদ্য- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: যে সকল খাদ্য সহজে হজম বা পরিপাক হয় না, সেগুলোকেই গুরুপাক খাদ্য বলা হয়। মাংস, পোলাও, বিরিয়ানি ইত্যাদি গুরুপাক খাদ্য। কারণ, এগুলো সহজে পরিপাক হয় না। এজন্য এসব খাদ্য খাওয়ার পর কোমল পানীয়, দই, বোরহানি ইত্যাদি পান করা হয়।
৯১. এসিড ব্যবহারে সাবধান হতে হবে কেন?
উত্তর: কিছু কিছু এসিড, বিশেষ করে শক্তিশালী এসিডসমূহ (যেমন-H2SO4, HNO3, HCl) মানবত্বকের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এছাড়া এসিড আমাদের অনেক প্রয়োজনীয় ও নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রেরও ক্ষয়সাধন করে। আমাদের শরীরে কোথাও এসিড লাগলে সেই স্থান পুড়ে যায় ও মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি হয়। এসিড কাপড়ে লাগলে কাপড় পুড়ে যায় ও ছিদ্র হয়ে যায়। একইভাবে ধাতব পদার্থসমূহ এসিডের সংস্পর্শে আসলে তাও ক্ষয় হয়ে যায়। একটু অসতর্কতাতেই এসিড যে কারও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে, এমনকি মানুষ মারাও যেতে পারে। এজন্যই এসিডের ব্যবহারে আমাদের খুবই সাবধান হতে হবে।
৯২. নির্দেশক ব্যবহার করে কীভাবে বিভিন্ন বস্তুর অম্লত্ব ও ক্ষারকত্ব চিহ্নিত করা যায়?
উত্তর: নির্দেশক হলো এমন পদার্থ যা কোনো দ্রবণে বর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমে এসিড বা ক্ষারের উপস্থিতি নির্দেশ করে। যেমন- লিটমাস কাগজ, মিথাইল অরেঞ্জ, ফেনফথ্যালিন ইত্যাদি। পরীক্ষাগারে সাধারণত এসিড, ক্ষারক ও নিরপেক্ষ দ্রবণ শনাক্তকরণে বিভিন্ন নির্দেশক ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ক্ষারীয় দ্রবণে লাল লিটমাস কাগজ রাখলে তার বর্ণ নীল হয়ে যাবে। আবার এই নীল লিটমাস কাগজ এসিডিক দ্রবণে রাখলে তার বর্ণ লাল হয়ে যাবে। এভাবে লিটমাস কাগজকে নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করে এসিড ও ক্ষার চিহ্নিত করা যায়।
৯৩. কমলায় এসিড থাকলেও তা আমাদের ক্ষতির কারণ নয়- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: কমলায় প্রচুর পরিমাণে সাইট্রিক এসিড বিদ্যমান। সাইট্রিক এসিড দুর্বল জৈব এসিড হওয়ায় তা আমাদের জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং কমলায় প্রাপ্ত এই এসিড আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। এই এসিড রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। তাই, কমলায় বিদ্যমান এসিড আমাদের ক্ষতির কারণ নয়।
৯৪. বোলতার কামড়ে আক্রান্ত স্থানে ভিনেগার বা বেকিং সোডা ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত কিনা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বোলতার হুল থেকে হিস্টামিন নামক রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়। এটি ক্ষারীয় পদার্থ। বোলতা কামড়ালে ক্ষারীয় এ পদার্থের ক্রিয়ায় ত্বকে জ্বালা করে। তাই বোলতার কামড়ের জ্বালা নিবারণের জন্য এসিড জাতীয় পদার্থ থাকে এমন মলম ব্যবহার করা হয়। এসব মলমে ভিনেগার অথবা বেকিং সোডা থাকে। এগুলো ক্ষারকের সাথে বিক্রিয়া করে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। তাই বোলতার কামড়ে আক্রান্ত স্থানে ভিনেগার বা বেকিং সোডা ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত।
৯৫. সংক্ষেপে ক্ষারকের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: সকল ক্ষারক লাল লিটমাস কাগজের রং পরিবর্তন করে নীল করে। এছাড়া আরও কিছু নির্দেশক, যেমন- কমলা রঙের মিথাইল অরেঞ্জ এবং লাল রঙের মিথাইল রেডকে হলুদ রঙে পরিবর্তিত করে। ক্ষারকসমূহ পানিতে দ্রবীভূত হলে হাইড্রোক্সিল আয়ন (OH–) উৎপন্ন হয়।
NaOH → Na+ + OH–
এছাড়াও ক্ষারক এসিডের সাথে বিক্রিয়ায় লবণ ও পানি উৎপন্ন করে।
NaOH + HCl → NaCl + H2O
৯৬. আমাদের সুস্থতায় প্রশমন বিক্রিয়া প্রয়োজনীয় কেন?
উত্তর: পাকস্থলীতে এসিডিটির সমস্যা হলে যে এন্টাসিড খাওয়া হয়, তা মূলত Mg(OH)2 ও Al(OH)3। এন্টাসিড পাকস্থলীর HCl এর সাথে প্রশমন বিক্রিয়া করার মাধ্যমে এসিডিটি প্রশমিত করে। খাবার খাওয়ার পর আমাদের মুখে সৃষ্ট এসিডের কারণে দাঁতের ক্ষয় হয়। এ ক্ষয়রোধ করার জন্য টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করার ক্ষেত্রেও এই প্রশমন বিক্রিয়াই সংঘটিত হয়। তাই আমাদের সুস্থতায় প্রশমন বিক্রিয়া প্রয়োজনীয়।
৯৭. পানি ও লবণের সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: পানি ও লবণ উভয়েরই জলীয় দ্রবণ নিরপেক্ষ। উভয়েরই pH মান ৭ বা এর কাছাকাছি। পানি ও লবণ কোনোটিই লিটমাস কাগজের রং পরিবর্তন করে না। উভয়ই প্রশমন বিক্রিয়ার উৎপাদ অর্থাৎ এসিড ও ক্ষারের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়ে থাকে।
৯৮. শক্তিশালী ও দুর্বল এসিডের বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: যেসব এসিড পানিতে সম্পূর্ণরূপে বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন (H+) তৈরি করে তাদেরকে বলা হয় শক্তিশালী এসিড। শক্তিশালী এসিডের ক্ষেত্রে যতগুলো এসিডের অণু থাকে তার সবগুলোই বিয়োজিত হয়। যেমন: H2SO4, HNO3, HCl ইত্যাদি। দুর্বল এসিডের যতগুলো অণু থাকে তার সবগুলো হাইড্রোজেন আয়ন তৈরি করে না, অর্থাৎ পানিতে সম্পূর্ণভাবে বিয়োজিত না হয়ে আংশিকভাবে বিয়োজিত হয়। যেমন: CH3-COOH, C6H8O7 ইত্যাদি।
৯৯. প্রাত্যহিক জীবনে এসিডের ব্যবহার লেখো।
উত্তর: দৈনন্দিন জীবনের নানাক্ষেত্রে এসিডের ব্যবহার রয়েছে। পাকস্থলীতে খাদ্য হজমের জন্য হাইড্রোক্লোরিক এসিড, আচার সংরক্ষণে ভিনেগার, পাউরুটি ফোলাতে বেকিং সোডা, বাসাবাড়িতে আইপিএস ও গাড়ির ব্যাটারি তৈরি করার জন্য সালফিউরিক এসিড ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও কৃষি জমিতে প্রয়োগকৃত বিভিন্ন রাসায়নিক সারের মূল উপাদান হিসেবে নানা ধরনের এসিড ব্যবহৃত হয়।
১০০. এসিডের অপব্যবহারের সামাজিক প্রভাব লেখো।
উত্তর: আমাদের সমাজে কিছু খারাপ চরিত্রের লোক আছে যারা প্রতিহিংসা মেটাতে এসিডের অপব্যবহার করে থাকে। বেশিরভাগ সময় দেখা যায় অল্পবয়সী তরুণীদের মুখ এসিড মেরে ঝলসে দেওয়া হয়। এসিড-সন্ত্রাসের কারণে অনেক সম্ভাবনাময় ও মেধাবী ছাত্রীদের পড়াশোনা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এতে পরিবারে অকল্পনীয় দুঃখ নেমে আসে। এসিডের অপব্যবহারে পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনে ঘোর বিপর্যয় নেমে আসে।
১০১. লবণের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: লবণ হলো এসিড ও ক্ষারের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন পদার্থ। এটি একটি নিরপেক্ষ পদার্থ, কেননা এর pH মান ৭ এর কাছাকাছি। এটি নির্দেশকের বর্ণ পরিবর্তন করে না। তবে কিছু কিছু লবণের জলীয় দ্রবণ অম্লীয় বা ক্ষারীয় হতে পারে। যেমন- বেকিং সোডা (NaHCO3) ও সোডিয়াম কার্বোনেট (Na2CO3)। বেকিং সোডার জলীয় দ্রবণ অম্লীয় এবং সোডিয়াম কার্বনেটের জলীয় দ্রবণ ক্ষারীয়। কার্বনেট লবণগুলো এসিডের সাথে বিক্রিয়া করে অন্য একটি লবণ, কার্বন ডাইঅক্সাইড ও পানি তৈরি করে।
১০২. প্রাত্যহিক জীবনে লবণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: আমরা খাবারের স্বাদ বৃদ্ধিতে লবণ ব্যবহার করি। আচার, চানাচুর, পাউরুটি তৈরিতে লবণ ব্যবহার করা হয়। কাপড় কাচার জন্য যে সোডা ব্যবহার করি তা মূলত সোডিয়াম কার্বনেটের লবণ। জীবাণুনাশক হিসেবে এবং কৃষি জমিতে মাটির এসিডিটি ও ক্ষারকত্ব নিষ্ক্রিয় করতে লবণ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া চামড়া শিল্পে, টেক্সটাইল ও রং তৈরির কারখানায়ও লবণ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ সকল কারণে প্রাত্যহিক জীবনে লবণ গুরুত্বপূর্ণ।
১০৩. এসিডের বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য জলীয় দ্রবণ গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: এসিডের বৈশিষ্ট্যসূচক ধর্ম প্রদর্শনের জন্য এসিডে বিদ্যমান হাইড্রোজেনকে আয়নে রূপান্তরিত হওয়া প্রয়োজন। বিশুদ্ধ এসিডে হাইড্রোজেন পরমাণু আয়নে রূপান্তরিত হয় না। অর্থাৎ বিশুদ্ধ এসিডে হাইড্রোজেন আয়ন অনুপস্থিত থাকে বলে বিশুদ্ধ এসিড বৈশিষ্ট্যসূচক ধর্ম প্রদর্শন করে না। তাই এসিডের বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য জলীয় দ্রবণ গুরুত্বপূর্ণ।
১০৪. নাইট্রিক এসিডকে শক্তিশালী এসিড বলা হয় কেন?
উত্তর: এসিডসমূহ পানিতে হাইড্রোজেন (H+) আয়ন তৈরি করে। যদি এসিডের সবগুলো অণু বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন তৈরি করে তাহলে সেই এসিডটি শক্তিশালী হয়। নাইট্রিক এসিডের সবগুলো অণু পানিতে বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন উৎপন্ন করে, তাই এটি একটি শক্তিশালী এসিড।
১০৫. শিশুদের ত্বকে বড়দের প্রসাধনী ব্যবহার করা উচিত নয় কেন?
উত্তর: নবজন্ম নেওয়া শিশুদের ত্বকের pH এর মান ৭ এর কাছাকাছি থাকে। অপরদিকে বড়দের ত্বক সাধারণত এসিডিক হয় এবং pH মান ৪-৬ এর মধ্যে থাকে। তাই বড়দের ত্বকের প্রসাধনী এসিডিক হয়। কোনো কোনো প্রসাধনীতে pH ৫.৫ হয়ে থাকে। তাই বড়দের জন্য যেসব প্রসাধনী ব্যবহৃত হয়, তা শিশুদের জন্য প্রযোজ্য নয়। এতে এসিডের প্রভাবে শিশুদের ত্বকের ক্ষতি হতে পারে।
১০৬. আমাদের পাকস্থলীতে কেন HCl এর মতো শক্তিশালী এসিড থাকে?
উত্তর: খাওয়ার পর পাকস্থলীতে জমা হওয়া খাদ্য বিভিন্ন এনজাইমের সাহায্যে পরিপাক হয়ে থাকে। পাকস্থলীতে থাকা খাদ্য হজমের জন্য এবং খাদ্য পরিপাককারী এনজাইমের কার্যক্রমের জন্য এসিডিক পরিবেশ বজায় রাখতে পাকস্থলীর pH মান ২ হওয়া প্রয়োজন, যা অত্যন্ত শক্তিশালী এসিডিক অবস্থা নির্দেশ করে। এই শক্তিশালী এসিডিক অবস্থা বজায় রাখতেই আমাদের পাকস্থলীতে HCl এর মতো শক্তিশালী এসিড তৈরি হয়।
১০৭. ব্রাশ করার সময় আমাদের মুখে প্রশমন বিক্রিয়া ঘটে- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: খাওয়ার পরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আমাদের মুখগহ্বরে এসিডিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। আমরা দাঁত ব্রাশ করার সময় যে টুথপেস্ট বা টুথ পাউডার ব্যবহার করি তাতে ক্ষারজাতীয় পদার্থ থাকে। টুথপেস্ট বা টুথ পাউডারের ক্ষার আমাদের মুখের এসিডের সাথে বিক্রিয়া করে মুখের এসিডিক অবস্থার প্রশমন করে। এভাবেই ব্রাশ করার সময় আমাদের মুখে প্রশমন বিক্রিয়া ঘটে।
১০৮. মাটির গঠন ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মাটি হলো নানারকম জৈব ও অজৈব রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ। সাধারণত মাটিতে বিদ্যমান পদার্থসমূহকে চার ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। এরা হলো খনিজ পদার্থ, জৈব পদার্থ, বায়বীয় পদার্থ ও পানি। আয়তন অনুসারে মাটিতে বিদ্যমান অজৈব বা খনিজ পদার্থের পরিমাণ ৪৫%, জৈব পদার্থ ৫%, পানি ২৫% এবং বায়বীয় পদার্থ ২৫%। মাটিতে পানি থাকে মাটির কণার মাঝে ফাঁকা স্থান বা রন্দ্রে। এই রন্দ্রের আকার-আকৃতির উপর মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা নির্ভর করে।
১০৯. মৃত জীবদেহ থেকে কীভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস সৃষ্টি হয়েছে?
উত্তর: লক্ষ লক্ষ বছর আগে মরে যাওয়া গাছপালা ও প্রাণীর পচা দেহাবশেষ কাদা ও পানির সাথে ভূগর্ভে জমা হয়। সময়ের সাথে সাথে এগুলো বিভিন্ন রকম শিলা স্তরে ঢাকা পড়ে। শিলা স্তরের চাপে পঁচা দেহাবশেষ ঘনীভূত হয় এবং প্রচণ্ড চাপে ও তাপে দেহাবশেষে বিদ্যমান জৈব পদার্থ প্রাকৃতিক গ্যাসে পরিণত হয়।
১১০. মাটিতে অক্সিজেন বিদ্যমান থাকে কেন?
উত্তর: মাটি অনেক জীবের বৃদ্ধি ও আবাসস্থল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, হলো মাটিতে থাকা অসংখ্য অণুজীব। এই অণুজীবের বেড়ে ওঠার জন্য অক্সিজেন অত্যাবশ্যক। অক্সিজেন না থাকলে এরা বাঁচতে পারে না। আবার অক্সিজেন পানিতে অদ্রবণীয় খনিজ পদার্থকে ভেঙ্গে দ্রবণীয় পদার্থে পরিণত করে যা পরে মাটিতে থাকা পানির দ্বারা উদ্ভিদে স্থানান্তরিত হয়। এসকল কারণেই মাটিতে অক্সিজেন বিদ্যমান থাকে।
১১১. মাটিতে পানি না থাকলে উদ্ভিদের টিকে থাকা সম্ভব হতো না – ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের খাবার তৈরি করে এবং অক্সিজেনের সরবরাহ করে। এই খাদ্য তৈরির একটি প্রধান উপাদান হলো মাটিতে থাকা পানি। উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি (যেমন খনিজ পদার্থ, নাইট্রোজেন ফসফরাস ইত্যাদি) মাটি থেকে সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না। এগুলো গ্রহণ করে মূলের সাহায্যে এবং এক্ষেত্রে পানি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তাই পানি না থাকলে উদ্ভিদের পুষ্টিগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে উদ্ভিদের টিকে থাকা সম্ভব হতো না।
১১২. মাটি অত্যন্ত মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মাটিতে গাছপালা জন্মায়। গাছপালা থেকেই আমরা খাদ্যশস্য ও অক্সিজেন পাই। জীবনধারণের জন্য দরকারি পানির একটি বড় অংশ আসে মাটির নিচ থেকে। মাটিতেই আমরা ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানা, রাস্তাঘাট তৈরি করি। এছাড়াও মাটির নিচ থেকে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির সিংহভাগ আহরণ করে থাকি। এজন্য মাটি অত্যন্ত মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ।
১১৩. মাটির বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মাটি হলো নানারকম জৈব ও অজৈব পদার্থের মিশ্রণ। এলাকাভেদে মাটির গঠন ভিন্ন হয়। মাটিতে বিদ্যমান খনিজ পদার্থসমূহ অজৈব যৌগ নামে পরিচিত। মাটিতে বিদ্যমান প্রধান প্রধান খনিজ পদার্থ বা অজৈব পদার্থসমূহ হলো ক্যালসিয়াম (Ca), অ্যালুমিনিয়াম (Al), ম্যাগনেসিয়াম (Mg) ইত্যাদি। মাটিতে বিদ্যমান জৈব পদার্থ হিউমাস নামে পরিচিত। হিউমাস কালচে রঙের এবং এটি মৃত গাছপালা আর প্রাণীর দেহাবশেষ থেকে গঠিত।
১১৪. ভালো ফলনের জন্য মাটির pH অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ভালো ফলনের জন্য মাটির pH অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বেশির ভাগ ফসলের ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ উৎপাদন পাওয়া যায় মাটির pH নিরপেক্ষ অর্থাৎ এর মান ৭ বা তার খুব কাছাকাছি হলে। তাই কোনো একটি জমির মাটি পরীক্ষা করে যদি দেখা যায় এর pH ৭ এর চেয়ে বেশি কম বা বেশি তাহলে এর pH ৭ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১১৫. মাটি দূষণের ফলাফল লেখো।
উত্তর: মাটি দূষণের ফলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। দূষিত মাটিতে থাকা ক্ষতিকর পদার্থ বিভিন্ন উপায়ে প্রাণীদেহে প্রবেশ করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। এছাড়া মাটি দূষণের ফলে জলাশয় দূষণসহ পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনাও ঘটতে পারে।
১১৬. মাটি সংরক্ষণে কী কী কৌশল অবলম্বন করা যায়?
উত্তর: মাটি সংরক্ষণের বিভিন্ন কৌশলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
– মাটিতে ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ ও অন্যান্য গাছপালা রোপণ করা।
– রাসায়নিক সারের বদলে জৈব সার ব্যাবহার করা।
– একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ না করে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করা উচিত।
– নদীর পাড়ে কলমি, ধনচে ইত্যাদি গাছ লাগানো।
১১৭. মাটিতে অবস্থিত খনিজের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম কীরূপ হয়?
উত্তর: খনিজ পদার্থসমূহ সাধারণত দানাদার বা কেলাসাকার হয়। অনেক খনিজ পদার্থ আছে যাদের রাসায়নিক সংযুক্তি একই কিন্তু তাদের কেলাস গঠন ভিন্ন। ফলে তাদের ভৌত ধর্মও ভিন্ন। খনিজ পদার্থের রাসায়নিক ধর্ম নির্ভর করে এতে বিদ্যমান উপাদানের উপর।
১১৮. খনিজের ব্যবহার এবং সংরক্ষণের একটি কৌশল ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। আমরা নানা কাজে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে থাকি। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইউরিয়া সার উৎপাদন। বিদ্যুৎ উৎপাদনে, শিল্প-কারখানায়, বাসা-বাড়িতে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়। খনিজ সম্পদ তথা প্রাকৃতিক গ্যাস সংরক্ষণের কৌশল হলো বাসা-বাড়িতে বিনা প্রয়োজনে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখা থেকে বিরত থাকা এবং এই ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করা।
১১৯. কীভাবে গ্যাসের অপচয় রোধ করা যায়?
উত্তর: বাসা-বাড়িতে বিনা প্রয়োজনে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে না রেখে বন্ধ রাখতে হবে। গ্যাসের অবৈধ সংযোগ স্থাপন বন্ধ করতে হবে। আবার জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক নাটিকা বা বিজ্ঞাপন প্রচার করা যেতে পারে। এভাবেই গ্যাসের অপচয় রোধ করা সম্ভব।
১২০. মাটিতে যেসকল অণুজীব রয়েছে সেগুলো কীভাবে বেঁচে থাকে?
উত্তর: বেশিরভাগ অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য শ্বসন প্রয়োজন। শ্বসনের জন্য অক্সিজেন দরকার হয়। মাটির কণার মধ্যকার ফাঁকা স্থান বা রন্দ্রে বায়বীয় পদার্থ থাকতে পারে। মাটিতে থাকে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস। মাটিতে থাকা অণুজীবসমূহ মাটিতে বিদ্যমান অক্সিজেন ব্যবহার করে শ্বাস-প্রশ্বাস চালায় এবং বেড়ে ওঠে।
১২১. মাটির আন্তঃকণা দূরত্বের প্রয়োজনীয়তা লেখো।
উত্তর: মাটির কণার মাঝে ফাঁকা স্থান রন্দ্র বা আন্তঃকণা খুব সূক্ষ্ম। মাটির এ আন্তঃকণা পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। মাটির প্রকারভেদে আন্তঃকণার দূরত্ব একই না হওয়ায় সব মাটির পানি ধারণক্ষমতা সমান নয়।
১২২. মাটির হাড়িপাতিল তৈরি করতে কুমারেরা কাদা মাটি কেন ব্যবহার করেন?
উত্তর: কাদা মাটির বৈশিষ্ট্য থেকে দেখা যায় এই মাটি অনেকটা আঠালো। এই মাটির কণাগুলো খুব সূক্ষ্ম হয়, ফলে এদের মধ্যকার রন্দ্র খুব ছোট আর সরু হয়। কাদা মাটি আঠালো হওয়ায় একে খুব সহজেই যেকোন আকৃতি দেওয়া যায়। এছাড়া এই মাটি দিয়ে তৈরি হাড়িপাতিল শুকানোর পর তা বেশ শক্ত ও মজবুত হয়। এ সকল কারণে হাড়িপাতিল তৈরি করতে কুমারেরা কাদা মাটি ব্যবহার করেন।
১২৩. ফসল উৎপাদনের জন্য মাটির অম্লত্ব বা ক্ষারত্ব জানা প্রয়োজন কেন?
উত্তর: অম্লত্ব বা ক্ষারত্ব পরিমাপক হলো pH। pH দ্বারা কোনো দ্রবণের এসিড বা ক্ষারের মাত্রা নির্ণয় করা যায়। মাটির স্বাভাবিক pH হলো ৪-৮। সব pH এর মাটিতে সব ফসল ভালো হয় না। যেসব ফসল অম্লীয় মাটিতে জন্মে সেগুলো ক্ষার মাটি সহ্য করতে পারে না। আবার ক্ষারীয় মাটিতে জন্মানো ফসল অম্লতা সহ্য করতে পারে না। বেশিরভাগ ফসলের ক্ষেত্রে মাটির pH এর মান ৭ বা তার খুব কাছাকাছি হলে সর্বোচ্চ উৎপাদন পাওয়া যায়। তাই ফসল সঠিকভাবে উৎপাদনের জন্য মাটির অম্লত্ব বা ক্ষারত্ব জানা প্রয়োজন।
১২৪. বালু মাটি ও পলি মাটির মধ্যে দুটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর: বালু মাটি ও পলি মাটির মধ্যে দুটি পার্থক্য হলো:
| বালু মাটি | পলি মাটি |
|---|---|
| ১. মাটির কণাগুলোর আকার বেশ বড়। | ১. মাটির কণাগুলোর আকার বেশ ছোট। |
| ২. পানি ধারণ ক্ষমতা অনেক কম। | ২. পানি ধারণ ক্ষমতা ভালো। |
১২৫. মাটি দূষণের কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বিভিন্নভাবে মাটি দূষিত হয়। শিল্পকারখানা ও গৃহস্থলির বর্জ্য মাটি দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কারখানা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে বের হয়ে আসা তেজস্ক্রিয় পদার্থ দিয়ে মাটি মারাত্মকভাবে দুষিত হতে পারে। এছাড়া নদীভাঙ্গন বা অন্য কোনো কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত পলির দ্বারা এবং খনিজ পদার্থ উত্তোলনের জন্য খনন কাজের দরুন মাটির দুষণ ঘটে থাকে।
১২৬. টপ সয়েলই ফসল উৎপাদনের উপযোগী স্তর – ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ভূমি থেকে নিচের দিকে মাটি দিগবলয় বা হরাইজোন নামক ৪টি সমান্তরাল স্তরে বিভক্ত। এর মধ্যে সবার উপরে যে স্তরটি থাকে তাকে বলে হরাইজোন A বা টপ সয়েল। এই স্তরেই উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহে পচন শুরু হয় এবং উৎপাদিত পদার্থ, বিশেষ করে হিউমাসসহ অন্যান্য জৈব পদার্থ এই স্তরেই থাকে। হিউমাসসহ অন্যান্য জৈব পদার্থ থাকে বলে টপ সয়েলই ফসল উৎপাদনের জন্য উপযোগী স্তর।
১২৭. অতিরিক্ত পলি কীভাবে মাটি দূষণ করে?
উত্তর: অতিরিক্ত পলি পানির মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে মাটিতে জমা হয়। নদী ভাঙনের ফলে নদীর পাড় ভাঙা মাটি বা অন্য যে কোনোভাবে সৃষ্ট মাটি পানির দ্বারা প্রবাহিত হয়ে এক পর্যায়ে গিয়ে কোথাও না কোথাও তলানি আকারে পড়ে এবং সেটি কখনো নদ-নদী, খাল-বিল ইত্যাদির তলদেশে জমা হতে পারে আবার কখনো ফসলি জমিতে জমা হতে পারে। এসব তলানিতে ক্ষতিকর পদার্থ থাকলে তা মাটিতে পড়ে এবং মাটি দূষিত হয়। এভাবে অতিরিক্ত পলি থেকে মাটি দূষিত হয়।
১২৮. ফসল চাষাবাদের জন্য কোন মাটি উপযোগী?
উত্তর: ফসল চাষাবাদের জন্য দোআঁশ মাটি খুবই উপযোগী। কারণ, এই মাটি বালি, পলি ও কাদামাটির সমন্বয়ে তৈরি হয়। দোআঁশ মাটির একদিকে যেমন পানি ধারণক্ষমতা ভালো আবার প্রয়োজনের সময় পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে। তাই ফসল চাষাবাদের জন্য দোআঁশ মাটি খুবই উপযোগী।
১২৯. একই জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করা উচিত কেন?
উত্তর: একই জমিতে একই ফসল বার বার চাষ করলে জমিতে pH মানের প্রভাব পড়ে। ফলে কয়েক বছর পর ঐ জমি উক্ত ফসলের জন্য উপযুক্ত pH সরবরাহ করতে পারে না। ফলে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পায়। আবার একই ফসল বারবার একই জমিতে চাষ করলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়। তাই একই জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করা উচিত।
১৩০. লিটমাস পেপার দিয়ে মাটির অম্লত্ব বা ক্ষারত্ব নির্ণয় প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: pH এর মান সাধারণত লিটমাস কাগজ দিয়ে নির্ণয় করা যায়। pH মান থেকে এসিডিক, ক্ষারীয় না নিরপেক্ষ তা বোঝা যায়। মাটির সাথে পানি মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করে তাতে লিটমাস পেপার দিয়ে মাটির অম্লত্ব বা ক্ষারত্ব নির্ণয় করা যায়। কোন এলাকার মাটি pH ৭ এর কম হলে ঐ মাটি এসিডিক এবং এর জলীয় দ্রবণ নীল লিটমাসকে নীল করে। ক্ষারীয় মাটির pH ৭ এর বেশি এবং এর জলীয় দ্রবণ লাল লিটমাসকে নীল করে।
১৩১. তোমার পরিচিত একটি মিশ্র পদার্থের নাম ও গঠন ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আমার পরিচিত পদার্থ মাটি একটি মিশ্র পদার্থ। মাটিতে বিভিন্ন ধরনের পদার্থ থাকে। সাধারণত মাটিতে বিদ্যমান পদার্থসমূহকে চার ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। এরা হলো খনিজ পদার্থ, জৈব পদার্থ, বায়বীয় পদার্থ ও পানি। তবে এসব পদার্থ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একে অপরের সাথে মিশে এক ধরনের জটিল মিশ্রণ তৈরি করে এবং একটিকে আরেকটি থেকে সহজে পৃথক করা যায় না। তাই মাটি যৌক্তিকভাবেই মিশ্র পদার্থ।
১৩২. পলি মাটি কীভাবে শনাক্ত করা সম্ভব?
উত্তর: পলি মাটি শনাক্ত করার জন্য কিছু পদ্ধতি রয়েছে। কিছু পানিযুক্ত মাটি নিয়ে আঙ্গুল দিয়ে ঘষলে যদি মসৃণ অনুভূত হয় তাহলে এটা পলি মাটি। যদি হাতের সাথে লেগে থাকে তাহলে সেটা পলি মাটি। যদি মাটির কণাগুলো পানিতে ভাসমান থাকে এবং পরবর্তী এক পর্যায়ে তলায় জমা পড়ে তাহলে সেটাই পলি মাটি।
১৩৩. তেজস্ক্রিয় পদার্থ কীভাবে মাটির দূষণ করে?
উত্তর: পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বা অস্ত্র তৈরির কারখানা থেকে দুর্ঘটনা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে যে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিঃসৃত হয় তা মাটি দূষণ ঘটায়। তেজস্ক্রিয় পদার্থ বিনষ্ট হয় না বলে দীর্ঘ সময় ধরে মাটিতে রয়ে যায় এবং খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়ে। মাটিতে চলমান বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতিসাধন করে। এভাবেই তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো যেমন- রেডন, রেডিয়াম, থোরিয়াম মাটি দূষণকে ত্বরান্বিত করে।
১৩৪. বালু মাটি ও কাদা মাটির মধ্যে কোন মাটি পানি ধরে রাখতে পারে না? কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: কাদা মাটির কণাগুলো খুব সূক্ষ্ম হয়, ফলে কণাগুলোর মধ্যকার রন্দ্র খুব ছোট আর সরু থাকে। এজন্য কাদা মাটি থেকে সহজে পানি নিষ্কাশিত হয় না। অপরদিকে, বালু মাটির কণার আকার সবচেয়ে বড়, যার ফলে কণাগুলোর মাঝে ফাঁকা জায়গা অনেক বেশি থাকে। তাই এ মাটিতে পানি দিলে তা দ্রুত নিষ্কাশিত হয়। এজন্য কাদা মাটি পানি ধরে রাখতে পারলেও বালু মাটি পানি ধরে রাখতে পারে না।
১৩৫. মৌলের কেলাস গঠনের ভিন্নতার জন্য ভৌত ধর্মের ভিন্নতা ঘটে- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: অনেক মৌল আছে যাদের রাসায়নিক সংযুক্তি একই, কিন্তু তাদের কেলাস গঠন ভিন্ন, ফলে তাদের ভৌত ধর্মও ভিন্ন। যেমন- গ্রাফাইট ও ডায়মন্ড। যদিও দুটি পদার্থই কার্বন দ্বারা গঠিত, কিন্তু কেলাস গঠনের ভিন্নতার কারণে গ্রাফাইট নরম হলেও ডায়মন্ড সবচেয়ে শক্ত খনিজ পদার্থ। তাই দেখা যাচ্ছে মৌলের কেলাস গঠনের ভিন্নতার জন্য ভৌত ধর্মের ভিন্নতা ঘটে।
১৩৬. প্রাকৃতিক গ্যাস কেন প্রক্রিয়াকরণ করা হয়?
উত্তর: প্রাকৃতিক গ্যাস মূলত মিথেন গ্যাস। কিন্তু খনি থেকে উত্তোলনের সময় এতে অপদ্রব্য হিসেবে অন্যান্য পদার্থ যেমন তেল, বেনজিন, বিউটেন, পানি, নাইট্রোজেন ইত্যাদি থাকে। এসব পদার্থ আলাদা করার জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ করা হয়।
১৩৭. জীবাশ্ম জ্বালানি কি অফুরন্ত? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: জীবাশ্ম জ্বালানি অফুরন্ত নয়। প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, পেট্রোলিয়াম ইত্যাদি হলো জীবাশ্ম জ্বালানি; প্রকৃতিতে এসব জ্বালানির পরিমাণ নির্দিষ্ট ও সীমিত। এগুলো তৈরি হতে কোটি কোটি বছর সময় লাগে। তাই এগুলোর অপব্যবহার কোনো উৎস থেকে সরবরাহ না থাকার কারণে জীবাশ্ম জ্বালানি একসময় শেষ হয়ে যাবে।
১৩৮. বৈদ্যুতিক পাখা সুইচ বন্ধ করার সাথে সাথে থেমে যায় না কেন?
উত্তর: বৈদ্যুতিক পাখা সুইচ বন্ধ করার সাথে সাথে বন্ধ হয় না। কারণ গতি জড়তার কারণে গতিশীল বস্তুটি এর গতি বজায় রাখার প্রবণতা দেখায়। ফলে পাখাটি আরো কিছু সময় পর্যন্ত ঘোরে এবং বায়ুর বাধা ও ফ্যানের শ্যাফটের ঘর্ষণের কারণে ধীরে ধীরে থেমে যায়।
১৩৯. ভরবেগের পরিবর্তন এবং বলের মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করো।
উত্তর: নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রানুসারে বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক আর ভরবেগ = ভর × বেগ।
প্রযুক্ত বল ∝ (ভরবেগের পরিবর্তন / সময়)
বা, F ∝ ΔP / t
বা, F ∝ (m × ΔV) / t
অর্থাৎ F = (m × ΔV) / t, যা নির্ণেয় সম্পর্ক।
১৪০. বেগ ও ত্বরণের মধ্যে দুইটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর: বেগ ও ত্বরণের মধ্যে পার্থক্য-
| বেগ | ত্বরণ |
|---|---|
| i. একক সময়ে কোনো বস্তুর সরণকে বেগ বলে। | i. একক সময়ে কোনো বস্তুর বেগের পরিবর্তনের হারকে ত্বরণ বলে। |
| ii. বেগের একক ms-1। | ii. ত্বরণের একক ms-2। |
১৪১. 10 N বল বলতে কী বোঝ? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: 10 N বল বলতে বোঝায়-
ক. 1 kg ভরের কোনো বস্তুর উপর উক্ত বল প্রয়োগ করলে 10 ms-2 ত্বরণ সৃষ্টি হয়।
খ. 10 kg ভরের কোনো বস্তুর উপর উক্ত বল প্রয়োগ করলে 1 ms-2 ত্বরণ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, কিলোগ্রাম এককে বস্তুর ভর ও মি./সে² এককে বস্তুর ত্বরণের গুণফল 10 হওয়াকেই 10 N বলা হয়।
১৪২. মহাকর্ষ বল শুধুমাত্র আকর্ষণ বল- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: এ মহাবিশ্বের সকল বস্তু একে অপরকে যে বলে আকর্ষণ করে তাকে মহাকর্ষ বলে। দুইটি বস্তুর মধ্যে একটি যদি পৃথিবী হয় তখন তাকে অভিকর্ষ বল বলে। মহাকর্ষ বল কেবলমাত্র আকর্ষণ বল। অর্থাৎ বিকর্ষণ বলের কোন ধারণা মহাকর্ষ বলে নেই।
১৪৩. ঘর্ষণ বৃদ্ধির তিনটি উপায় লেখো?
উত্তর: ঘর্ষণ বৃদ্ধির জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়-
i. যে দুটি তলে ঘর্ষণ হচ্ছে, সেগুলো অমসৃণ বা খসখসে করে তোলা।
ii. যে দুটি তলে ঘর্ষণ হচ্ছে, যেগুলো আরো জোরে চেপে দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
iii. বাতাস বা তরলের ঘনত্ব বাড়ানো।
১৪৪. নিউটনের ১ম সূত্রানুসারে জড়তা ও বলের গুণগত ধারণা দাও।
উত্তর: নিউটনের প্রথম সূত্র থেকে আমরা জানি, কোনো বস্তুই নিজের থেকে এর অবস্থান পরিবর্তন করতে চায় না। বস্তু স্থির থাকলে স্থির থাকতে চায়, গতিশীল থাকলে গতিশীল থাকতে চায়। বস্তু যে অবস্থায় আছে, চিরকাল সেই অবস্থায় থাকতে চাওয়ার প্রবণতাই জড়তা। বস্তুর অবস্থান পরিবর্তনের জন্য বাইরে থেকে কিছু একটা প্রয়োগ করতে হয়, যা বস্তুর অবস্থান পরিবর্তন করে বা করতে চায়, তাকেই বল বলা হয়। অর্থাৎ যা স্থির বস্তুর উপর ক্রিয়া করে তাকে গতিশীল করে বা করতে চায় বা যা গতিশীল বস্তুর উপর ক্রিয়া করে তার গতির পরিবর্তন করে বা করতে চায়, তাকে বল বলে।
১৪৫. হঠাৎ বাঁক নেওয়া গাড়ির যাত্রীরা অন্যদিকে ঝুঁকে পড়ে কেন?
উত্তর: হঠাৎ বাঁক নেওয়া গাড়ির যাত্রীরা অন্যদিকে ঝুঁকে পড়ে। এর কারণ গাড়ি চলার সময় গাড়ির গতির দিকে যাত্রীরাও সমান গতিতে গতিশীল থাকে। গাড়ি হঠাৎ দিক পরিবর্তন করলেও জড়তার কারণে যাত্রী মূল দিক বজায় রাখতে চাওয়ার ফলে এক পাশে সরে যায় অর্থাৎ অন্যদিকে ঝুঁকে পড়ে।
১৪৬. নিউটনের ২য় সূত্র থেকে কীভাবে বলের পরিমাপ করা যায়?
উত্তর: নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রটি হলো- বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক।
এই সূত্র থেকে আমরা বল পরিমাপ করতে পারি।
বস্তুর ভরবেগ = ভর × বেগ
∴ ভরবেগের পরিবর্তনের হার = ভর × বেগের পরিবর্তনের হার = ভর × ত্বরণ
[∵ বেগের পরিবর্তনের হার হলো ত্বরণ]
সুতরাং নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রানুসারে, বল = ভর × ত্বরণ
১৪৭. ঠেলাগাড়ি ধাক্কার চেয়ে টানা সহজ কেন?
উত্তর: ঠেলাগাড়িকে ধাক্কা দিলে প্রযুক্ত বল দুইভাগে ভাগ হয়। একটি বল উলম্বভাবে নিচের দিকে কাজ করে যা ওজনের সাথে যুক্ত হয়ে ট্রলিটির ওজন বাড়ায়। আর আনুভূমিক বলটি ঠেলাগাড়িকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। অন্যদিকে ঠেলাগাড়ি টানা হলে বলের একটি অংশ ঠেলাগাড়ির ওজন কমাতে সাহায্য করে, ফলে ঠেলাগাড়ি টানতে সুবিধা মনে হয়।
১৪৮. হাঁটতে গিয়ে আমরা হোঁচট খাই কেন?
উত্তর: নিউটনের প্রথম সূত্র থেকে আমরা জানি বস্তু যে অবস্থায় আছে চিরকাল সেই অবস্থায় থাকতে চাওয়ার যে প্রবণতা বা সেই অবস্থা বজায় রাখতে চাওয়ার যে ধর্ম, তাই জড়তা। জড়তা দুই প্রকার। স্থিতি জড়তা ও গতি জড়তা। গতিশীল বস্তুর গতিশীল থাকার প্রবণতাই হল গতি জড়তা। হাটার সময় কোন বাধা আমাদের থামিয়ে দিলে গতি জড়তার জন্য আমরা হোঁচট খাই।
১৪৯. টেবিলে আঘাত করলে হাতে ব্যথা লাগে কেন?
উত্তর: যখন টেবিলে বল প্রয়োগ করা হয়, তখন টেবিলও বিপরীতমুখী একটা বল প্রয়োগ করে যা নিউটনের তৃতীয় সূত্রানুসারে সমান। অর্থাৎ ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বল পরস্পর সমান ও বিপরীতমুখী। এই প্রতিক্রিয়া বলের জন্যই টেবিলে আঘাত করলে হাতে ব্যথা লাগে।
১৫০. প্রতিক্রিয়া বল কখনো শূন্য হওয়া সম্ভব কি? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্রানুসারে, প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বল সবসময়ই দুটি ভিন্ন বস্তুর ওপর ক্রিয়া করে; কখনো একই বস্তুর ওপর ক্রিয়া করে না। প্রতিক্রিয়া বলটি ততক্ষণই থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত ক্রিয়া বলটি থাকবে। অর্থাৎ ক্রিয়া বল থামার সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া বল শূন্য হবে।
১৫১. ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বল সবসময় দুটি ভিন্ন বস্তুর ওপর কাজ করে- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বল সবসময় দুটি ভিন্ন বস্তুর ওপর কাজ করে, কখনোই একই বস্তুর ওপর কাজ করে না। অর্থাৎ A বস্তু যদি B বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করে, তাহলে B বস্তু A বস্তুর উপর বিপরীত দিকে সমান বল প্রয়োগ করবে। প্রতিক্রিয়া বলটি ততক্ষণই থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত ক্রিয়া বলটি থাকবে। ক্রিয়া থেমে গেলে প্রতিক্রিয়াও থেমে যায়।
১৫২. গাড়ির টায়ারে খাঁজ কাটা থাকে কেন?
উত্তর: রাস্তা ও গাড়ির চাকার মধ্যকার ঘর্ষণ বাড়ানোর জন্য গাড়ির টায়ারে খাঁজ কাটা থাকে। এতে করে গাড়িকে ব্রেক করে থামানো সহজ হয়। রাস্তা মসৃণ হলে ঘর্ষণ বল কম উৎপন্ন হবে। টায়ার যাতে ভালোভাবে রাস্তা আঁকড়ে ধরতে পারে এবং ভিজা রাস্তায় পিছলে না যায়, সেজন্য গাড়ির টায়ারে খাঁজ কাটা থাকে।
১৫৩. আমাদের জীবনে বলের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতিদিনই কোনো কিছু টানতে বা ঠেলতে বা ধাক্কা দিতে হয়। কোনো স্থির বস্তুকে গতিশীল করা, গতিশীল বস্তুকে থামিয়ে দেওয়া বা গতি বাড়ানো কমানোর জন্য বল প্রয়োজন। গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ঘর্ষণ বল প্রয়োজন। মহাবিশ্বের গঠন ও অস্তিত্ব বজায় রাখতে নিউক্লীয় বল ও মহাকর্ষ বল ভূমিকা রাখে। তাই বলা যায়, আমাদের জীবনে বলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
১৫৪. নিউটনের প্রথম সূত্রানুসারে জড়তার ধারণা দাও।
উত্তর: কোনো বস্তু যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় থাকতে চাওয়ার প্রবণতাকে বস্তুর জড়তা বলে। অর্থাৎ স্থির বস্তু স্থির; গতিশীল বস্তু গতিশীল থাকার প্রবণতাকে জড়তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। নিউটনের ১ম সূত্র থেকে এ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সূত্রটি হলো: বাহ্যিক বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু স্থির ও সমবেগে চলতে থাকা বস্তু সমবেগে গতিশীল থাকবে। জড়তা দুই ধরনের হয়- স্থিতি জড়তা ও গতি জড়তা।
১৫৫. ক্রিকেট খেলায় বোলার কিছুটা দৌড়ে এসে বল করে কেন?
উত্তর: ক্রিকেট খেলায় বোলার কিছুটা দৌড়ে এসে বল করে। কারণ এতে বলের গতি বৃদ্ধি পায়। বোলার যখন দৌড়ে আসে তখন তার মধ্যে গতি জড়তার সঞ্চার হয়। এতে করে বলটি দ্রুতগতিতে নিক্ষেপ করতে পারে। তাই বল করার সময় বোলার কিছুটা দৌড়ে এসে বল করে।
১৫৬. ভরবেগের পরিবর্তন না হলে বলের মান পাওয়া যাবে কি?
উত্তর: আমরা জানি, বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক। অর্থাৎ, বল ∝ (ভরবেগের পরিবর্তন / সময়)।
অতএব দেখা যাচ্ছে, ভরবেগের পরিবর্তন না হলে অর্থাৎ শূন্য হলে প্রযুক্ত বলের মান শূন্য হবে।
১৫৭. সূর্য থেকে প্রাপ্ত আলো ও তাপের উৎস কোন বল? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: সূর্য থেকে প্রাপ্ত আলো ও তাপের উৎস সবল নিউক্লীয় বল। পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটন ও নিউটনের মধ্যকার যে শক্তিশালী বল কাজ করে তাকে সবল নিউক্লীয় বল বলে। এ বল খুবই অল্প দূরত্বে (10-15m) কাজ করে। সূর্যের মধ্যে হাইড্রোজেন ভাঙনের মাধ্যমে যে প্রচণ্ড শক্তি, আলো ও তাপ তৈরি হয় তা এই সবল নিউক্লীয় বলের ফল।
১৫৮. এরোপ্লেনের সামনের অংশে কী কারণে এরোডাইনামিক আকৃতি দেয়া হয়?
উত্তর: প্রবাহী ঘর্ষণজনিত বাধা দূর করার জন্য এরোপ্লেনের সামনের অংশে এরোডাইনামিক আকৃতি দেয়া হয়। যখন কোনো বস্তু তরল/বায়বীয় পদার্থের ভিতর দিয়ে যায়, তখন যে ঘর্ষণ বল কাজ করে, তা হচ্ছে প্রবাহী ঘর্ষণ। এরোপ্লেনের সামনের অংশ একটু কোনাকৃতি হয় যাতে করে বাতাসের বাধা কম করা যায়। এ কারণে এরোডাইনামিক আকৃতি দেয়া হয়।
১৫৯. ব্যবহারিক জীবনে ঘর্ষণের সুবিধা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ঘর্ষণকে প্রয়োজনীয় উপদ্রব বলা হয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্মে ঘর্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা ঘর্ষণ ছাড়া জীবন কল্পনা করতে পারি না। ঘর্ষণ না থাকলে আমরা হাঁটতে পারতাম না, জুতা পরতে পারতাম না, পানি খেতে পারতাম না। ঘর্ষণ থাকাতে আমরা নিরাপদে প্যারাস্যুটে অবতরণ করতে পারি। গাড়ি চালাতে পারি। পেন্সিল দিয়ে কাগজে লিখতে পারি।
১৬০. কোনো বস্তুর স্থিতি বা গতির উপর বলের প্রভাব ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বল কোনো স্থির বস্তুর ওপর প্রযুক্ত হলে তাতে গতির সৃষ্টি করে বা করতে চায়। এছাড়া কোনো গতিশীল বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করা হলে তার গতির অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ কোনো বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করলে তা ঐ বস্তুর গতিবেগের মান বা দিক বা উভয়ের পরিবর্তন ঘটায়।
১৬১. রকেট কীভাবে চলে তা নিউটনের তৃতীয় সূত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: রকেট চালানো হয় নিউটনের তৃতীয় সূত্র তথা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বলের ওপর ভিত্তি করে। রকেটে জ্বালানি পুড়িয়ে প্রচুর গ্যাস উৎপন্ন করা হয়। রকেট সেই গ্যাসের ওপর বল প্রয়োগ করে। এ বল হচ্ছে ক্রিয়া। এ ক্রিয়ার ফলে গ্যাস প্রচন্ড বেগে রকেটের পেছন দিয়ে নির্গত হওয়ার সময় জ্বালানিও রকেটের ওপর সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া বল প্রয়োগ করে। ফলে রকেটটি উৎপন্ন গ্যাসের গতির বিপরীত দিকে এগিয়ে চলে।
১৬২. নিউটনের তৃতীয় সূত্রের সাহায্যে বন্দুকের পশ্চাৎ বেগ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বন্দুকের পশ্চাৎ বেগ নিউটনের তৃতীয় সূত্র থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। বন্দুক থেকে গুলি ছুড়লে, গুলিটি সামনের দিকে বল প্রাপ্ত হয়। ফলে তা বিপরীত থেকে অর্থাৎ, পেছনে একটি প্রতিক্রিয়া বল প্রয়োগ করে। এতে বন্দুকটি পেছনে সরে আসে এটিই বন্দুকের পশ্চাৎ বেগ।
১৬৩. গাড়ির ইঞ্জিন কেন গরম হয়? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ঘর্ষণের কারণে গাড়ির ইঞ্জিন গরম হয়। গাড়ির সিলিন্ডারে পিস্টনকে ওঠানামা করার সময়ে সেখানে ঘর্ষণের জন্য তাপের সৃষ্টি হয়। আর সেই তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য গাড়ির ইঞ্জিনকে শীতল রাখতে হয়।
১৬৪. তড়িৎ বিশ্লেষণ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: কোনো দ্রবণের মধ্যে তড়িৎ প্রবাহিত করে এর অণুগুলোকে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক অংশে বিভক্ত করার পদ্ধতিকেই তড়িৎ বিশ্লেষণ বলে। তড়িৎ প্রবাহের দ্বারা দ্রবণের যে দ্রবটিকে দুই ভাগে বিভক্ত বা বিশ্লেষণ করা হয় তাকে তড়িৎ দ্রব বা তড়িৎ বিশ্লেষ্য পদার্থ বলে। তড়িৎ দ্রবের মধ্যে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়নের মাধ্যমে তড়িৎ প্রবাহ চলে।
সকল এসিড, ক্ষার, কয়েকটি নিরপেক্ষ লবণ, এসিড মেশানো পানি ইত্যাদি তড়িৎ দ্রব বা তড়িৎ বিশ্লেষ্য পদার্থ। যেমন- H2SO4, HNO3, CuSO4, AgNO3, NaOH ইত্যাদি।
১৬৫. তড়িৎ প্রলেপন বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: তড়িৎ বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে কোনো ধাতুর উপর সুবিধামতো অন্য কোনো ধাতুর প্রলেপ দেওয়ার প্রক্রিয়াই হলো তড়িৎ প্রলেপন। তামা, লোহা, ব্রোঞ্জ ইত্যাদি নিকৃষ্ট ধাতু দিয়ে তৈরি জিনিসকে জলবায়ু থেকে রক্ষা করার এবং সুন্দর দেখানোর জন্য এদের উপর কোনো সোনা, রূপা, নিকেল ইত্যাদি মূল্যবান ধাতুর প্রলেপ দেওয়া হয়।
১৬৬. তড়িৎ ক্ষমতা বলতে কী বোঝ?
উত্তর: আমরা জানি, কাজ করার হার অর্থাৎ একক সময়ে সম্পন্নকৃত কাজকে ক্ষমতা বলে। কোনো তড়িৎযন্ত্র প্রতি সেকেন্ডে যে পরিমাণ তড়িৎশক্তি ব্যয় করে বা অন্য শক্তি যেমন- তাপ, আলো যান্ত্রিক ইত্যাদিতে রূপান্তরিত করে তাকে তড়িৎ ক্ষমতা বলে। তড়িৎ ক্ষমতাকে কিলোওয়াট বা মেগাওয়াটে প্রকাশ করা হয়।
1 কিলোওয়াট = 1000 ওয়াট বা 103 ওয়াট এবং
1 মেগাওয়াট = 106 ওয়াট।
১৬৭. এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহারের সুবিধা কী?
উত্তর: বর্তমানে প্রযুক্তির কারণে এনার্জি সেভিং বাল্ব অত্যন্ত সহজলভ্য হয়ে গেছে। এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহারের ফলে আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণমুক্ত থাকে। এনার্জি সেভিং বাল্বে বিদ্যুৎ ২০-৮০% সাশ্রয় হতে পারে এবং সাধারণ বাল্বের তুলনায় এটি ৩ থেকে ২৫ গুণ বেশি সময় টিকে থাকতে পারে। তাছাড়া এ বাল্বে ব্যবহার করে আমরা শক্তির অপচয় রোধ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আমাদের নির্ভরতা কমাতে পারি। তাই আমাদের এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহার করা উচিত।
১৬৮. ইউপিএস কীভাবে কাজ করে?
উত্তর: ইউপিএস এমন একটি যন্ত্র যা কিছু সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সঞ্চয় করে রাখতে পারে। এতে রেকটিফায়ার, ব্যাটারি ও ইনভারটার নামক তিনটি অংশ থাকে। এই ব্যাটারিতেই সঞ্চিত থাকে বিদ্যুৎ শক্তি। ফলে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে সাধারণত ১০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই ব্যাটারিতে সঞ্চিত বিদ্যুৎ সরবরাহ হতে পারে। তাই বিদ্যুৎ চলে গেলেও ব্যবহৃত যন্ত্র যেমন- কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যায় না।
১৬৯. লোডশেডিং বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: তড়িতের উৎপাদন যদি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হয় তবে সব এলাকাতেই পর্যায়ক্রমে তড়িৎ সরবরাহ বন্ধ করতে হয়। তড়িৎ সরবরাহের এই পদ্ধতি হলো লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় তড়িতের স্বল্প উৎপাদন, তড়িতের সিস্টেম লস, তড়িতের অপচয়, তড়িতের যান্ত্রিক ত্রুটি ইত্যাদির কারণে লোডশেডিং-এর প্রয়োজন পড়ে।
১৭০. দুটি সাধারণ ব্যাটারি সেলকে সংযুক্ত করলে মোট বিভব পার্থক্য কত হবে? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: দুটি সাধারণ ব্যাটারি সেলকে সংযুক্ত করার দুটি উপায় রয়েছে। একটি হলো ব্যাটারি সেলগুলোর সিরিজ সংযোগ এবং অপরটি হলো সমান্তরাল সংযোগ। সিরিজ সংযোগে অর্থাৎ একটি ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্ত পরেরটির ঋণাত্মক প্রান্তের সাথে লাগালে ব্যাটারির বিভব যোগ হয়। অর্থাৎ, দুটি ১.৫ ভোল্টের ব্যাটারি সিরিজ সংযোগে যুক্ত করলে মোট বিভব পার্থক্য হবে (১.৫ + ১.৫) ভোল্ট বা ৩ ভোল্ট। আবার, ব্যাটারি দুটিকে সমান্তরালভাবে লাগানো হলে অর্থাৎ, সবকটির ধনাত্মক প্রান্ত একসাথে এবং সবকটির ঋণাত্মক প্রান্ত একসাথে লাগালে বিভবের পরিবর্তন হয় না। অর্থাৎ, দুটি ব্যাটারি একত্রে বিভব পার্থক্য ১.৫ ভোল্ট প্রদান করবে।
১৭১. বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের সময় প্লাস্টিকের শুষ্ক জুতা ব্যবহার করা উচিত কেন?
উত্তর: বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের মূল দুটি তার হলো জীবন্ত তার ও নিরপেক্ষ তার। জীবন্ত তার সাধারণত লাল রঙের এবং নিরপেক্ষ তার সাধারণত কালো রঙের হয়। জীবন্ত তার যদি খালি পায়ে অর্থাৎ মাটিতে পা রেখে ধরা হয় তবে তার ভিতর দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ চলবে এবং বৈদ্যুতিক শক লাগবে। তাই তড়িৎ সংযোগের কাজ করার জন্য প্লাস্টিকের শুষ্ক জুতা ব্যবহার করা উচিত।
১৭২. সাধারণত ব্যাটারি সেলের তুলনায় বাসার বৈদ্যুতিক সংযোগ বিপজ্জনক কেন?
উত্তর: একটি সাধারণ ব্যাটারি সেলের তুলনায় বাড়িতে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ সংযোগ বিপজ্জনক। কারণ, ব্যাটারি সেলের বিভব পার্থক্য মাত্র ১.৫V। অপরদিকে, আমাদের বাসার বিদ্যুৎ সাপ্লাই ২২০V। উল্লেখ্য যে, বিদ্যুৎ সাপ্লাই ৫০V থেকে বেশি হলে আমরা সেটি অনুভব করতে পারি। সে ক্ষেত্রে, ২২০V সাপ্লাই থেকে অনেক বড় ইলেট্রিক শক হওয়া সম্ভব। এই ইলেকট্রিক শকের কারণে শরীরের ভেতর দিয়ে যথেষ্ট বিদ্যুৎ প্রবাহ হলে মানুষের মৃত্যুও হতে পারে।
১৭৩. হাউজ ওয়্যারিং-এ মেইন সুইচ, মিটার ও ফিউজ বা সার্কিট ব্রেকারের কাজ লেখো।
উত্তর: মেইন সুইচ, মিটার ও ফিউজ বা সার্কিট ব্রেকারের কাজ নিম্নরূপ-
মেইন সুইচ: পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ প্রবাহ চালু বা বন্ধ করতে ব্যবহৃত হয়।
মিটার: বাড়িতে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ শক্তি খরচ হচ্ছে তা মিটারে লিপিবদ্ধ হয়।
ফিউজ বা সার্কিট ব্রেকার: বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের জন্য ফিউজ ব্যবহার করা হয়। ফিউজ সবসময় জীবন্ত তারের সাথে সংযুক্ত করা হয়। বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত ফিউজের মান বিভিন্ন হয়। যেমন- লাইটের জন্য ৫A, ফ্যানের জন্য ১০A এবং হিটারের জন্য ১৫A ফিউজ ব্যবহার করা হয়। এটি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রবাহ রোধ করে বৈদ্যুতিক যন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়।
১৭৪. বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে?
উত্তর: বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতা হলো-
১. বাতি বা পাওয়ার সুইচের যাবতীয় ফিউজ যেন জীবন্ত তারের সাথে সংযোগ দেওয়া হয় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
২. সমস্ত তার পিভিসি বা যেকোনো অপরিবাহী পদার্থ দ্বারা মোড়ানো হতে হবে।
৩. তার যেন প্রয়োজনীয় লোড নিতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বিদ্যুৎ প্রবাহের সময় তার উত্তপ্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
১৭৫. আয়ন বলতে কী বোঝ?
উত্তর: স্বাভাবিক অবস্থায় পরমাণু বা অণুতে ইলেকট্রনের সংখ্যা নিউক্লিয়াসে অবস্থিত প্রোটনের সংখ্যার সমান হয়ে থাকে। কোনো অণু, পরমাণু বা যৌগমূলকে যদি ইলেকট্রনের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কম বা বেশি থাকে তাহলে তাকে আয়ন বলে। ইলেকট্রনের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কম হলে তাকে ধনাত্মক আয়ন বলে। আর যদি ইলেকট্রনের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয় তাহলে তাকে ঋণাত্মক আয়ন বলে।
১৭৬. ব্যাটারির কার্যক্রম ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ব্যাটারিতে মূলত তিনটি অংশ থাকে। একটি অ্যানোড, একটি ক্যাথোড এবং মাঝখানে ইলেকট্রোলাইট। ব্যাটারি সেলে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অ্যানোড থেকে ইলেকট্রন সরিয়ে ক্যাথোডে জমা করা হয়। এর ফলে অ্যানোড ও ক্যাথোডের মধ্যে তড়িৎ বিভব পার্থক্য তৈরি হয়। এ অবস্থায় অ্যানোড এবং ক্যাথোডকে পরিবাহী তার দ্বারা সংযুক্ত করলে ক্যাথোডের ইলেকট্রনগুলো অ্যানোডে প্রবাহিত হতে থাকে। ইলেকট্রন প্রবাহের বিপরীত দিকে বিদ্যুৎ প্রবাহ ধরে নেওয়া হয়। ফলে অ্যানোড থেকে ক্যাথোডে বিদ্যুৎ প্রবাহ হচ্ছে বলা হয়। এভাবে ব্যাটারির রাসায়নিক শক্তি তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
১৭৭. কোন ধরনের বর্তনী বাড়িতে তড়িৎ সংযোগের জন্য উপযোগী নয়? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আমরা দুই ধরনের তড়িৎ সংযোগের সম্পর্কে বইতে পড়েছি। যথা- ১. শ্রেণি সংযোগ ও ২. সমান্তরাল সংযোগ। এ দুটোর মধ্যে শ্রেণি সংযোগ বাড়িতে তড়িৎ সংযোগের জন্য উপযোগী নয়। শ্রেণি বা সিরিজ বর্তনীতে তড়িৎ সংযোগে সংযুক্ত বাল্ব বা ফ্যানের সুইচ অন করলে সবগুলো একসাথে জ্বলে উঠবে এবং ফ্যান চলতে থাকবে। আবার সুইচ অফ করলে সবগুলো একই সাথে অফ হয়ে যাবে। কিন্তু বাড়িতে সকল বৈদ্যুতিক উপকরণ পৃথকভাবে চালু ও বন্ধ করার পদ্ধতি থাকতে হয়। তাই, বাড়িতে বৈদ্যুতিক সংযোগে শ্রেণি সংযোগ উপযোগী নয়।
১৭৮. তড়িৎ প্রলেপন কীভাবে ছাপার কাজে সহযোগিতা করে?
উত্তর: তড়িৎ মুদ্রণের সাহায্যে ছাপার কাজে ব্যবহৃত ছাঁচ তৈরি করা হয়। তড়িৎ প্রলেপের একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে হরফ, ব্লক মডেল ইত্যাদি তৈরি করাকে তড়িৎ মুদ্রণ বলে। তড়িৎ মুদ্রণের জন্য প্রথমে কোনো লেখা সাধারণ টাইপে মোমের ওপর ছাপ নেওয়া হয়। এর উপরে কিছু গ্রাফাইট গুঁড়ো ছড়িয়ে একে তড়িৎ পরিবাহী করা হয়। তারপর কপার সালফেট দ্রবণে এটি ক্যাথোড পাত হিসেবে ডুবানো হয় এবং একটি তামার পাতকে অ্যানোড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এখন দ্রবণের মধ্যে তড়িৎ প্রবাহ চালালে মোমের ছাঁচের ওপর তামার প্রলেপ পড়বে। প্রলেপ খানিকটা পুরু হলে ছাঁচ থেকে ছাড়িয়ে ছাপার কাজে ব্যবহার করা হয়। এভাবে তড়িৎ প্রলেপন ছাপার কাজে সহযোগিতা করে।
১৭৯. খাবার লবণ তড়িৎ বিশ্লেষ্য হলেও চিনি তড়িৎ বিশ্লেষ্য নয় কেন?
উত্তর: তড়িৎ বিশ্লেষণ হলো কোন দ্রবণের মধ্যে তড়িৎ প্রবাহিত করে এর অণুগুলোকে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক অংশে বিভক্ত করার পদ্ধতি। তড়িৎ প্রবাহের দ্বারা দ্রবণের যে দ্রব্যটিকে দুই ভাগে বিভক্ত বা বিশ্লেষণ করা হয় তাকে তড়িৎ দ্রব্য বা তড়িৎ বিশ্লেষ্য পদার্থ বলে। খাবার লবণ তড়িৎ বিশ্লেষ্য কারণ একে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায় কিন্তু চিনির ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়।
১৮০. ১ কিলোওয়াট-ঘণ্টাকে জুলে রূপান্তর করো।
উত্তর: এক কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো তড়িৎ যন্ত্রের মধ্য দিয়ে এক ঘণ্টা তড়িৎ প্রবাহিত হলে যে পরিমাণ তড়িৎ শক্তি অন্য শক্তিতে রূপান্তরিত হয় (যেমন- বাতি জ্বললে আলোক শক্তি ও পাখা ঘুরলে যান্ত্রিক শক্তি পাওয়া যায়), তাই হলো এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা।
১ কিলোওয়াট-ঘণ্টা = ১০০০ ওয়াট × ৩৬০০ সেকেন্ড
= ৩৬০০০০০ ওয়াট-সেকেন্ড
= ৩৬০০০০০ জুল।
১৮১. IPS ও UPS এর মধ্যে পার্থক্য কী কী?
উত্তর: IPS ও UPS এর পার্থক্য হলো-
| IPS | UPS |
|---|---|
| ১. আইপিএস হলো ইনস্ট্যান্ট পাওয়ার সাপ্লাই। | ১. ইউপিএস হলো আনইন্টারাপটিবল পাওয়ার সাপ্লাই। |
| ২. IPS সাধারণত লাইট, ফ্যান চালু করার কাজে ব্যবহার করা হয়। | ২. ডেস্কটপ কম্পিউটার কিংবা সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির বেলায় ইউপিএস ব্যবহার করা হয়। |
| ৩. এটি ডিসি প্রবাহ। | ৩. এটি এসি প্রবাহ। |
| ৪. IPS এর বিদ্যুৎ প্রবাহ ক্ষমতা বেশি। | ৪. UPS এর বিদ্যুৎ প্রবাহ করার ক্ষমতা কম। |
১৮২. তড়িৎ বর্তনীর প্রতীক বলতে কী বোঝ?
উত্তর: তড়িৎ বর্তনীর নকশা বা চিত্র আঁকার সুবিধার্থে প্রত্যেকটি যন্ত্রের বা সংযোগের একটি প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। এসকল প্রতীক চিহ্নকে তড়িৎ বর্তনীর প্রতীক বলে। যেমন- তড়িৎকোষের প্রতীক, একমুখী সুইচের প্রতীক, অ্যামিটারের প্রতীক ইত্যাদি।
১৮৩. H2SO4, HNO3, CuSO4 ও AgNO3 তড়িৎ দ্রবগুলো কীভাবে আয়নে বিভক্ত হয়?
উত্তর: তড়িৎ বিশ্লেষণ বা ইলেকট্রোলাইসিসের সময় তড়িৎ দ্রব্য ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক আয়নে বিভক্ত হয় এবং ঋণাত্মক আয়নের প্রবাহ দিয়ে দ্রবণে বিদ্যুৎ প্রবাহ করা হয়। তড়িৎ দ্রব্যগুলো নিচে দেখানো উপায়ে আয়নে বিভক্ত হয়-
H2SO4 → 2H+ + SO4−
HNO3 → H+ + NO3−
CuSO4 → Cu++ + SO4−−
AgNO3 → Ag+ + NO3−
১৮৪. তুঁতের দ্রবণের তড়িৎ বিশ্লেষণে, নিষ্ক্রিয় তড়িৎদ্বার ব্যবহার করলে দ্রবণের ঘনত্ব কমে যায় কেন?
উত্তর: CuSO4 পানিতে দ্রবীভূত হয়ে Cu++ ও SO4− আয়নে বিশ্লিষ্ট হয়। দ্রবণের মধ্যে দুটি নিষ্ক্রিয় তড়িৎদ্বার ডুবিয়ে তড়িৎকোষ সংযুক্ত করলে আয়নের প্রবাহ শুরু হয়। Cu++ আয়নগুলো ক্যাথোড দ্বারা আকৃষ্ট হয় এবং ক্যাথোড থেকে দুটি ইলেকট্রন গ্রহণ করে Cu এ পরিণত হয়। অন্যদিকে SO4− অ্যানোডে দুটি ইলেকট্রন ত্যাগ করে SO4 এ পরিণত হয়। কিন্তু অ্যানোড নিষ্ক্রিয় হওয়ায় অ্যানোড থেকে Cu নিয়ে CuSO4 তৈরি হয় না। তাই দ্রবণে CuSO4 এর ঘনত্ব কমতে থাকে।
১৮৫. তড়িতের সিস্টেম লসের কারণ কী?
উত্তর: সাধারণভাবে তড়িৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যপথে বিদ্যুতের অপচয়ই হলো সিস্টেম লস। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত তারের মধ্যে যে রোধ থাকে সেই রোধের কারণে বিদ্যুৎ প্রবাহের সময় তাপ উৎপন্ন হয়ে শক্তির লস বা ক্ষয় হয়। এ লসই সিস্টেম লস। সিস্টেম লসের আরও কিছু কারণ হলো- তড়িৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও গ্রাহকের মাঝপথে বৈদ্যুতিক লাইন থেকে অবৈধভাবে লাইন টেনে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা, যার কোনো হিসাব মিটারে থাকে না। এ অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে উৎপন্ন তড়িৎ ও ব্যবহৃত তড়িতের গরমিল দেখা যায় এবং সিস্টেম লস দেখা যায়।
১৮৬. অ্যানোড ও ক্যাথোডের মধ্যে কী কী পার্থক্য রয়েছে?
উত্তর: অ্যানোড ও ক্যাথোডের মধ্যে পার্থক্য হলো-
| অ্যানোড | ক্যাথোড |
|---|---|
| ১. অ্যানোড ধনাত্মক তড়িৎ দ্বার। | ১. ক্যাথোড ঋণাত্মক তড়িৎ দ্বার। |
| ২. অ্যানোডে জারণ ঘটে। | ২. ক্যাথোডে বিজারণ ঘটে। |
| ৩. অ্যানোড ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। | ৩. ক্যাথোড ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। |
১৮৭. কিলোওয়াট-ঘণ্টা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: এক কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো তড়িৎ যন্ত্রের মধ্য দিয়ে এক ঘণ্টা ধরে তড়িৎ প্রবাহিত হলে যে পরিমাণ তড়িৎশক্তি অন্য শক্তিতে রূপান্তরিত হয় তাই হলো কিলোওয়াট ঘণ্টা। অর্থাৎ
১ কিলোওয়াট-ঘন্টা = ১০০০ ওয়াট × ৩৬০০ সেকেন্ড = ৩৬০০০০০ জুল।
১৮৮. উন্নয়ন কার্যক্রমে বিদ্যুতের অবদান ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: একটি দেশ কতটুকু উন্নত তা বোঝা যায় দেশটিতে কতটুকু শক্তি ব্যবহার হচ্ছে তা থেকে। দেশের উন্নয়নের জন্য সবার প্রথম দরকার শিক্ষা। শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে দরকার হয় বিদ্যুৎ। এছাড়াও কৃষি, স্বাস্থ্য, শিল্প, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদিতেও শক্তি তথা বিদ্যুতের ব্যবহার অনস্বীকার্য। যেমন- কৃষিতে সেচ, সার তৈরি ইত্যাদি কাজে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের কাজে এবং হাসপাতালে সব সময় বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।
১৮৯. কীভাবে তড়িতের অপচয় রোধ করা যায়? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: শক্তির নানা রূপের মাঝে তড়িৎ বা বিদ্যুৎ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেশি হলেও এর উৎপাদন সীমিত। তাই বিদ্যুতের অপচয় রোধে আমাদের সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। এজন্য আমরা সাধারণ বাল্বের পরিবর্তে এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহার করতে পারি। এছাড়া প্রয়োজন না হলে ফ্যান ও লাইট বন্ধ রেখে, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্র পরিহার করেও আমরা বিদ্যুতের অপচয় রোধে করতে পারি।
১৯০. সাধারণ ব্যাটারি সেল আর মোবাইল ফোনে ব্যবহৃত ব্যাটারি সেলের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: আমরা দৈনন্দিন জীবনে টর্চ লাইটে বা মোবাইল ফোনে ব্যাটারি সেল ব্যবহার করি।
টর্চলাইটের এবং মোবাইলের ব্যাটারি সেলে কিছু পার্থক্য রয়েছে। টর্চলাইটের সাধারণ ব্যাটারি সেলের রাসায়নিক পদার্থ বিক্রিয়া করে খরচ হয়ে যাওয়ার পর সেটি অ্যানোড এবং ক্যাথোডে আর বিভব পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে না বলে বিদ্যুৎ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু আমরা মোবাইলে যে ব্যাটারি ব্যবহার করি, সেগুলোর বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরির ক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে চার্জ করিয়ে নেওয়া যায়। তখন ব্যাটারির রাসায়নিক পদার্থগুলো পুনরায় রাসায়নিক বিক্রিয়া করে বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি করার জন্য প্রস্তুত হয়।
১৯১. ডিসি সাপ্লাই ও এসি সাপ্লাইয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: ডিসি সাপ্লাইয়ে বিভব পার্থক্য সবসময় সমান থাকে। অপরদিকে, এসি সাপ্লাইয়ে বিভব পার্থক্য সব সময় সমান থাকে না। ব্যাটারি সেল ডিসি সাপ্লাইয়ের এবং বাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সংযোগ এসি-সাপ্লাইয়ের উদাহরণ। আমাদের বাসায় যে বৈদ্যুতিক সাপ্লাই দেওয়া হয়, তা প্রতি সেকেন্ডে পঞ্চাশবার ধনাত্মক থেকে ঋণাত্মক বিভবে পরিবর্তিত হয়। ব্যাটারি সেলে এমন পরিবর্তন হয় না।
১৯২. বাড়িতে শ্রেণির তুলনায় সমান্তরাল তড়িৎ সংযোগ ব্যবস্থা ব্যবহারের সুবিধা কী?
উত্তর: বাড়িতে সমান্তরাল তড়িৎ সংযোগ ব্যবস্থা ব্যবহারের সুবিধা হলো-
১. সকল বৈদ্যুতিক উপকরণ পৃথকভাবে চালু- বন্ধ করা যায়।
২. সকল বৈদ্যুতিক উপকরণ প্রয়োজনীয় ভোল্টেজ পায়।
তড়িৎ সংযোগে সিরিজ বর্তনীর ক্ষেত্রে সুইচ অন করলে একইসাথে সকল বৈদ্যুতিক উপকরণ চালু হয়ে যায়। আবার, বন্ধ করলে সবগুলো একইসাথে বন্ধ হয়ে যাবে। সবগুলো সিরিজে থাকলে কোনো বাল্ব বা ফ্যানই প্রয়োজনীয় ভোল্টেজ পাবে না। ভাগাভাগি হওয়ার কারণে একটি নির্দিস্ট বাল্ব বা ফ্যানে ভোল্টেজ কমে যাবে। এ কারণে মূলত বাসায়, তড়িৎ সংযোগ সমান্তরাল সংযোগ ব্যবস্থা সেলে করা হয়।
১৯৩. তড়িৎ বিশ্লেষ্য পদার্থ বলতে কী বোঝ?
উত্তর: তড়িৎ প্রবাহ দ্বারা কোনো দ্রবণে দ্রবীভূত দ্রবকে দুই ভাগে বিভক্ত বা বিশ্লেষণ করা হয়। এই দ্রবকে তড়িৎ দ্রব বা তড়িৎ বিশ্লেষ্য পদার্থ বলে। সকল এসিড, ক্ষার, কয়েকটি নিরপেক্ষ লবণ, এসিড মেশানো পানি ইত্যাদি তড়িৎ দ্রব বা তড়িৎ বিশ্লেষ্য পদার্থ। যেমন- H2SO4, HNO3, CuSO4, AgNO3, NaOH ইত্যাদি।
১৯৪. একটি লোহার চামচের ওপর রূপার প্রলেপ দিতে কী করতে হবে?
উত্তর: লোহার চামচের ওপর রূপার প্রলেপ দিতে তড়িৎ প্রলেপন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। যে ধাতব বস্তুটির উপর প্রলেপ দিতে হবে, সেটি খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করে ক্যাথোড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যে ধাতুর প্রলেপ দিতে হবে তাকে অ্যানোড করা হয় এবং তড়িৎ দ্রব হিসেবে তার একটি লবণ ব্যবহার করা হয়। যেমন- রূপার প্রলেপ দিতে হলে রূপার অ্যানোড ও রূপার একটি লবণ AgNO3 ব্যবহার করা হয়। এরপর ব্যাটারি বা পাওয়ার সাপ্লাই ব্যবহার করে অ্যানোড থেকে ক্যাথোডে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করলে AgNO3 এর তড়িৎ বিশ্লেষণের ফলে ক্যাথোডে রাখা লোহার চামচের ওপর ধাতুর প্রলেপ পড়ে।
১৯৫. ধাতু নিষ্কাশন ও শোধনে তড়িৎ বিশ্লেষণের ভূমিকা কী?
উত্তর: খনি থেকে সাধারণত কোনো ধাতু বিশুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় না। এদের মধ্যে নানা ধাতুর মিশ্রণ থাকে, যাকে আকরিক বলা হয়। তড়িৎ বিশ্লেষণের সাহায্যে আকরিক থেকে সহজে ধাতু নিষ্কাশন ও তা শোষণ করা যায়।
১৯৬. কোনো বাল্বের গায়ে 220V-100W লেখা থাকলে কী বোঝা যাবে?
উত্তর: একটি বাল্বের গায়ে 220V ও 100W লেখা থাকলে বোঝা যায়, 220V বিভব পার্থক্যে বাল্বটিকে সংযুক্ত করলে বাল্বটি সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বলভাবে জ্বলবে। এ সময় প্রতি সেকেন্ডে 100 জুল বৈদ্যুতিক শক্তি আলো ও তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।





